ডিলারের নামে বরাদ্দ সার পান না চাষি, কৃত্রিম সংকট
কিশোরগঞ্জ ও মিঠামইন প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিশোরগঞ্জের ইটনায় পাচারের সময় বিএডিসির ১০৮ বস্তা ডাই অ্যামোনিয়া ফসফেট (ডিএপি) সার আটক করেছে নৌ পুলিশ। গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে এলংজুড়ি বাজার ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকাসহ এসব সার আটক করা হয়। গতকাল শনিবার বিষয়টি সমকালকে নিশ্চিত করেছেন ইটনার ধনপুর ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক জামাল হোসেন। তাঁর ভাষ্য, অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে পাচারকারীরা আগেই পালিয়ে যান।
৫০ কেজির বস্তায় পাঁচ হাজার ৪০০ কেজি ডিএপি সার রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কৃষক ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডিলারের বরাদ্দ পাওয়া সার ঠিকমতো এলাকায় না যাওয়ার কারণে চোরাই পথে এভাবে সারের ব্যবসা হচ্ছে। তাদের বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল জেলার প্রধান বোরো ধান উৎপাদনকারী এলাকা। আসন্ন বোরো মৌসুমের জন্য কৃষকরা জমি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আর এই পর্যায়ে জমিতে ডিএপি সারসহ পর্যাপ্ত ননইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয় বলে জানিয়েছেন চাষিরা। এ কারণে হাওরে ননইউরিয়া সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে ডিলারের কাছে পর্যাপ্ত সার পাওয়া যাচ্ছে না। এই সুযোগে চোরাকারবারিরা বিভিন্ন জায়গা থেকে অবৈধভাবে সার এনে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
এলংজুড়ির কৃষক হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন জানিয়েছেন, ডিলারের সার এলাকায় চাহিদামতো যাচ্ছে না। এই সুযোগে চোরাই পথে প্রচুর সার আসছে। আর কৃষকদের বাধ্য হয়ে চোরাই সার বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্যমতে, উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান এই ইউনিয়নের পাশাপাশি এলংজুড়ি ও জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের ডিলারের দায়িত্বে আছেন। তিনি সার তুললেও খুব কম পরিমাণেই এলংজুড়ি এলাকায় পৌঁছেছে। যে কারণে সংকটের সুযোগ নিয়ে চোরাকাবারিরা বাইরে থেকে সার আমদানি করছে। এক হাজার ৫৫০ টাকা বস্তার ডিএপি সারের জন্য বাড়তি ১০০-২০০ টাকা গুনতে হয় কৃষকদের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ডিলার আব্দুল মান্নান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বাদলা ইউনিয়ন শাখার সভাপতি। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ায় আব্দুল মান্নান মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে আছেন। যে কারণে সার সংকটের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি।
জব্দ করা ইঞ্জিনচালিত নৌকার মালিক ও মাঝি ইকবাল মিয়ার বাড়ি এলংজুড়ি এলাকায়। তাঁর ভাষ্য, এলংজুড়ি বাজারের তিন ব্যবসায়ী নবী হোসেন, খোকন মুন্সি ও কাঞ্চন মিয়া মিঠামইন থেকে ২৫০ বস্তা সার আনার জন্য তিন হাজার টাকায় নৌকাটি ভাড়া করেন। মিঠামইনের জনৈক বিল্লাল মাঝি ভৈরব থেকে বড় একটি নৌকা দিয়ে প্রচুর পরিমাণ সার আনেন। সেখান থেকে তাঁর (ইকবাল) নৌকায় ২৫০ বস্তা সার তোলা হয়। সেগুলোর মধ্যে ১৪২ বস্তা সার ব্যবসায়ীরা আগেই নৌকা থেকে নামিয়ে ফেলেন। বাকি ১০৮ বস্তা সার এলংজুরি নেওয়ার পর নৌ পুলিশ আটক করে।
নৌ পুলিশের ধনপুর ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক জামাল হোসেনের ভাষ্য, গোপনে তথ্য পেয়ে অভিযান চালিয়ে নৌকাসহ ১০৮ বস্তা ডিএপি সার আটক করা হয়েছে। তবে এর আগেই সারের কিছু বস্তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন। নৌকাবোঝাই সার তাদের হেফাজতে রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তা আজ রোববার ঘটনাস্থলে যাবেন। তাদের পরামর্শ নিয়ে নৌ পুলিশ এ বিষয়ে মামলা করবে।
ইটনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার হালদার জানিয়েছেন, এলংজুড়ি ইউনিয়নে ডিলারের অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন বাদলা ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার আব্দুল মান্নান। তবে জব্দ সারগুলো আব্দুল মান্নানের নয়, চোরাকারবারিদের। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ইউএনওর পরামর্শ অনুযায়ী মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। অন্য প্রশ্নের জবাবে বিজয় কুমার হালদার বলেন, এলংজুড়ি ও জয়সিদ্ধি ইউনিয়নে নতুন দুজন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাই ডিসেম্বর থেকে আব্দুল মান্নান এলংজুড়ি ও জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের কোনো সার বরাদ্দ পাবেন না।
- বিষয় :
- সার