এইচএসসির ফলাফল–২০২৬
পাঠ্যবই ও শ্রেণিকক্ষ বিমুখতা দায়ী, বলছেন শিক্ষকরা
এইচএসসির ফল প্রকাশিত হওয়ার পর নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্ছ্বসিত ছাত্রীরা। গতকাল শনিবার বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে সমকাল
সুমন চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিকে সবচেয়ে কম পাসের হার ছিল ২০০২ সালে। ওই বছর বোর্ডের ২৭ দশমিক ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছিলেন। ২০০৫ সাল থেকে পাসের হার ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যা ২০২১ সালে ৯৫ দশমিক ৭৬ শতাংশে পৌঁছায়। পরে নিম্নমুখী হয়ে গতকাল শনিবার প্রকাশিত ফলে পাসের হার হয়েছে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যা দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বরিশাল বোর্ডের ফলের বিপর্যয় কেন হয়েছে এ নিয়ে সমকালের কথা হয়েছে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে, তাদের ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার উত্তরপত্র দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের মূল্যায়নের সারমর্ম হলো– গত দুই-তিন বছর ধরে শিক্ষার্থীরা এক রকম পাঠ্যবই বিমুখ। আর ছেলে শিক্ষার্থীদের বড় অংশই শ্রেণিকক্ষে যান না। চলতি বছর পরীক্ষা গ্রহণের সময় কেন্দ্রে কড়াকড়ি আরোপ করায় এসব শিক্ষার্থীরাই হোঁচট খেয়েছে।
বিষয়টির ব্যাখ্যা করেন মুলাদী সরকারি কলেজের আইসিটি শিক্ষক মনোজ কুমার মল্লিক। তিনি ২০০৮ সাল থেকে এইচএসসির উত্তরপত্র দেখছেন। এই শিক্ষক গতকাল বলেন, ‘এবারও কিছু পরীক্ষার্থীদের আচরণে দেখা গেছে– কেন্দ্রে মাস্তানি কিংবা মব করে বই দেখে লিখবেন! কিন্তু প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা এ ধরনের সুযোগই পাননি।’
এবার আইসিটিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হওয়া প্রসঙ্গে মনোজ মল্লিক বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতির নিয়ম হলো, যে প্রশ্ন বিগত পরীক্ষায় একবার দেওয়া হয়েছে, পরে আর কোনো পরীক্ষায় ওই প্রশ্নপত্র আসবে না। নিয়মটি এ বছর থেকে কার্যকর হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেনি। তারা প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী গাইড বই ও টেস্ট পেপারে থাকা বিগত ৫ বছরের প্রশ্নের উত্তরগুলো আয়ত্ত করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু বিগত বছরের কোনো প্রশ্নই এবার রাখা হয়নি। যে কারণে যেসব পরীক্ষার্থী মূল বই পড়েছেন, তারা পাস করেছেন; যারা গাইড বই নির্ভরশীল তারা ধরা খেয়েছেন।
২০০২ সাল থেকে এইচএসসি উত্তরপত্রের পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন মুলাদী সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক হাফিজ আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, আগে যেভাবে তারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতেন, এখনও একই নিয়মে করেন। কিন্তু বিগত দুই-তিন বছর ধরেই ছেলেদের পাসের হার ক্রমাগত কমছে। যদিও মেয়েদের পাসের হার প্রায় একই আছে। তাঁর ধারণা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছেলেরা পড়াশোনা বিমুখ হয়ে পড়েছে। যারা লেখাপড়া করেন, তারা ঠিকই বেশি নম্বর পাচ্ছেন।
উত্তরপত্র দেখায় প্রায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা সহকারী অধ্যাপক পার্থ সারথী শর্মার। তিনি বরিশাল নগরীর অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ান। এ বছর ফল বিপর্যয়ের মূল্যায়ন করতে গিয়ে পার্থ সারথী শর্মা বলেন, করোনা মহামারির পর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্রেণিকক্ষ বিমুখতা বেড়েছে। গত দুই-তিন বছরে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ছেলে শিক্ষার্থীরা অনেকটা ক্লাস ছেড়েই দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এই ফলের মধ্যদিয়ে বিশেষ বার্তা রয়েছে বলে মনে করেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, মেয়েরা কেন ভালো করছেন, এ বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে ছেলে পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। তাঁর মতে, আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষকদের প্রতি নির্দেশনা থাকত, পাসের হার ও জিপিএ ৫ বাড়াতে হবে। এখনকার নির্দেশনা– উত্তরপত্রে যতটুকু লিখেছেন, ততটুকুই নম্বর দেওয়া হবে। পরীক্ষার্থী পাস করলেন কিনা, জিপিএ ৫ পেলেন কিনা, এসব বিবেচনায় আনা যাবে না।
- বিষয় :
- পরীক্ষার ফল