ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামে রেলওয়ে

রাস্তার কথা বলে কাটা হলো ছয় গাছ, ভিন্নমত কর্মীদের

নামমাত্র মূল্যে গাছগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়

রাস্তার কথা বলে কাটা হলো ছয় গাছ, ভিন্নমত কর্মীদের
×
×

কেটে নিয়ে যাওয়া গাছের গুড়ি। গত সোমবার তোলা সমকাল

 তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলীতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের একমাত্র ডিজেল লোকোমোটিভ অর্থাৎ ইঞ্জিন মেরামত কারখানার প্রবেশমুখেই মসজিদ কমপ্লেক্স। সামনে দিয়ে রেলওয়ের ডিজেল ওয়ার্কশপে ঢুকতেই চোখে পড়বে মেরামতের জন্য রাখা ট্রেনের অনেক ইঞ্জিন। এর পাশ ঘেঁষে পাথরের কার্পেটিং করা সরু পথ দিয়ে আরেকটু গেলেই দেখা যাবে জরাজীর্ণ একটি এবাদতখানা। এখানেই ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, মেহগনিসহ আরও দু-এক ধরনের ফল ও কাঠের গাছ। 
গত সোমবার সেখানে গিয়ে আর গাছগুলোর দেখা মেলেনি। কয়েক দিন আগে দিনদুপুরে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া কেটে ফেলা হয়েছে বহুবর্ষী ও ফলন্ত গাছগুলো। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সবুজ ক্যানভাস। বছরখানেক আগে একই জায়গা থেকে কেটে ফেলা হয় এই ধরনের আরও বেশ কয়েকটি গাছ। এভাবে গাছের ‘প্রাণসংহারে’ ক্ষুব্ধ কারখানার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ওয়াকর্শপের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, শেড নির্মাণ করতে গাছগুলো কাটা হয়েছে। তবে রেলওয়ের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, যে স্থানে শেড নির্মাণ করা হবে সেখানে গাছগুলো পড়েনি। চলাচলের পথ তৈরির কথা বলে গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। অথচ গাছগুলো থাকলেও চলাচলে ব্যাঘাত ঘটার কথা নয়।

শুধু ওয়ার্কশপের ভেতরে গাছ কাটা হচ্ছে এমন নয়, গাছ সংরক্ষণেও উদাসীন রেলওয়ে। রেলের বিভিন্ন এলাকায় নানা অজুহাতে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। কোথাও রেলওয়ে নিজেই গাছ কাটছে, আবার কোথাও কোথাও রেলওয়ে-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে দুর্বৃত্তরা গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে।
কারখানাটিতে গাছ কেটে ফেলার খবর পেয়ে দেখতে গেলে কথা হয় এক কর্মচারীর সঙ্গে। কাজ শেষ করার পর হাতে লেগে থাকা কালো রঙ-গ্রিজ সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলছিলেন তিনি। গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এই কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘জাম গাছটিতে থোকা থোকা জাম ধরত। পাকা জাম নিচে পড়ে থাকত। কাজ শেষে আমরা এই গাছের নিচে জিরিয়ে নিতাম। কুড়িয়ে জাম খেতাম। কিন্তু গাছটি কেটে ফেলা হলো। এ গাছ তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি। গাছগুলো কেটে ফেলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।’
গাছ কাটায় ক্ষুব্ধ আরেক কর্মচারী বলেন, ‘যে গাছগুলো আমাদের অক্সিজেন দিত, ফল দিত, ছায়া দিত, সেই গাছগুলো এভাবে কেটে ফেলা হত্যা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।’
এ ব্যাপারে কারখানাতেই কথা হয় রেলওয়ের ডিজেল ওয়ার্কশপের সিনিয়র সহকারী কর্মব্যবস্থাপক মো. মফিজ উদ্দিন ফকিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ইঞ্জিন মেরামতের জন্য একটি শেড নির্মাণ করছে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ। এ জন্য গাছগুলো কাটতে হচ্ছে।’ যেখানে শেড নির্মাণ করা হবে, সেখানে গাছগুলো পড়েনি– এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘গাছগুলো না কাটলে রাস্তা নির্মাণ করা যাবে না। রাস্তা প্রশস্ত করতেই গাছগুলো কাটা হয়েছে।’

কারখানার কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরখানেক আগে এখানকার পাঁচ-ছয়টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হয়। এবার ছয়টি গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেওয়া হলো। ক্রেতা কয়েক দিন আগে গাছগুলো কেটে নিয়ে গেছেন। এর মধ্যে দুটি করে জাম ও কাঁঠাল এবং দুটি মেহগনি গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছ ২০-২৫ বছরের পুরোনো। এসব গাছের গুঁড়ি (গোড়) দেখেই বোঝা যায়, কয়েক দিন আগে কাটা হয়েছে।
গত মাসেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গলভাটিয়ারিতে রেলওয়ে ও সরকারি খাসজমির বনায়নের শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়। এর মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০টি বড় সাইজের গাছও ছিল। তিন সপ্তাহ ধরে ফৌজদারহাট জলিল রেলস্টেশনের উত্তর-পূর্ব পাশে এবং পোর্ট লিংক-২ কনটেইনার ডিপোর দক্ষিণ পাশে জঙ্গলভাটিয়ারি এলাকায় প্রকাশ্যে গাছ কাটা হলেও নিশ্চুপ ছিল রেলওয়ে।
চট্টগ্রামে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা রিতু পারভী সমকালকে বলেন, গাছ নিয়ে বরাবরই উদাসীন রেলওয়ে। কারখানার ভেতরে পরিবেশের ভারসাম্য রাখা গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। এ ছাড়া আম, জাম, কাঁঠালের মতো ফলদ গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি উন্মত্ততা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। যারা কাজটি করেছেন, তারা বড় ধরনের অপরাধ করেছেন। 
 

আরও পড়ুন

×