প্রাণীর আক্রমণে ছয় মাসে চিকিৎসা ৩৮৮০ জনের
সোনাগাজী (ফেনী) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
কৃষক নুর হোসেনের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চর কৃষ্ণজয় এলাকায়। গত সোমবার রাতে ফসলি জমির পাশের সড়ক দিয়ে স্থানীয় বাজারে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ছোট্ট একটি সাপে তাঁকে কামড়ায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে তিনি ছুটে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, তাঁকে কামড়ানো সাপটি বিষধর নয়। এতে প্রাণে রক্ষা পেলেও আতঙ্কে আছেন এই কৃষক।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত অক্টোবরে এখানে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আহত হয়ে ৬৮৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। কৃষক নুর হোসেনের মতো সাপের কামড়ে আহত হয়ে চিকিৎসা নেন আরও ২৩ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল এই হাসপাতালে কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আহত হয়ে আসেন আরও ১০ রোগী। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সাত বয়সী মেয়েকে নিয়ে চর লামছি থেকে এসেছিলেন তার মা জান্নাতুন নাঈম। তিনি বলেন, গতকাল সকালে বাড়ির উঠানে কাজ করছিলেন তিনি। এ সময় পাশেই বসে ছিল তাঁর মেয়ে। হঠাৎ একটি কুকুর এসে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কুকুরটি শিশুটির ডান হাতে কামড় দেয়। লাঠি দিয়ে কুকুর তাড়িয়ে মেয়েকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা ও টিকা দিয়ে বাড়ি যেতে বলেছেন।
গত ছয় মাসে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কুকুর, বিড়াল ও সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট তিন হাজার ৮৮০ জন। এদের মধ্যে ৭২২ জন চিকিৎসা নেন সেপ্টেম্বর মাসে। আগস্টে ৭০৭ জন, জুলাইয়ে ৬২৫, জুনে ৬০২ ও মে মাসে ৫১৬ জন এসেছিলেন হাসপাতালে। আক্রান্তদের মধ্যে কুকুর ও বিড়ালের কামড়-আঁচড়ের রোগীই বেশি।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা (স্যাকমো) মো. সাদেকুল করিম গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তাঁর ভাষ্য, জলাতঙ্কের টিকা নিতে দিনে গড়ে ২০-২৫ জন হাসপাতালে আসছেন। রোগীর চাপ বাড়ায় সরকারি বরাদ্দের বাইরেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে টিকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
উপজেলাবাসীর ভাষ্য, চলতি মৌসুমে তীব্র গরম ও আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে বন-জঙ্গল ও গর্ত ডুবে যাওয়ায় আশ্রয় হারিয়ে সাপ লোকালয় ও মানুষের বসতবাড়িতে চলে আসছে। পাশাপাশি বাড়ছে বাড়িতে শখ করে বিড়াল পালনের প্রবণতা। পৌর এলাকার পাশাপাশি উপজেলার চর চান্দিয়া, সোনাপুর, চর ডুব্বা, উত্তর চর চান্দিয়া, আদর্শগ্রাম, চর সাহাভিকারী, আড়কাইম, চর মজলিশপুর, কুঠিরহাট, চাঁন্দলা, বাদুরিয়া, দৌলতকান্দি, চর গণেশ, সুলাখালী, বাদামতলী, সাহাপুর, সুজাপুর, আহম্মদপুর, চর কৃষ্ণজয়, ভোরবাজার, মজুপুর, সাতবাড়িয়াসহ কিছু এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব বেড়েছে।
পৌরসভার চর গণেশ এলাকার বাসিন্দা আকলিমা খাতুন শখে বাড়িতে তিনটি বিড়াল লালন-পালন করেন। এর মধ্যে একটি বিড়াল দুটি বাচ্চা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে বিড়ালের খাঁচা পরিষ্কার করতে যান তিনি। এ সময় একটি বিড়াল তাঁর হাতে আঁচড় দেয়। এতে রক্ত বের হয়ে যায়। পরদিন সকালেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জলাতঙ্কের টিকা নিয়েছেন।
পৌর শহরের ব্যবসায়ী মাহফুজুল হকের ভাষ্য, খাবারের সন্ধানে বেওয়ারিশ কুকুরগুলো অনেক সময় বেপরোয়া হয়ে মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক সময় শিশুদের কাঁধে স্কুলব্যাগ থাকলেও হাতে কিছু থাকে না। এ অবস্থায় হঠাৎ কুকুরের আক্রমণে তারা আহত হচ্ছে। বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণের দাবি তাঁর।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জলাতঙ্কের টিকা নিতে মানুষের ভিড় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দিনে ২০-২৫ জন আসছেন। কুকুর, বিড়াল, শিয়ালসহ কোনো প্রাণী কামড় বা আঁচড় দিলে দ্রুত হাসপাতালে আসার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষতস্থান সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুতে হবে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে জলাতঙ্কের টিকা ও চিকিৎসা নিতে হবে। সাপের কামড়ের ক্ষেত্রেও দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নেবু লাল দত্তের ভাষ্য, বর্তমানে অধিকাংশ বাড়িতেই বিড়াল পালনের প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু যারা বিড়াল পালন করছেন, তাদের অনেকেই প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও টিকাদান সম্পর্কে সচেতন নন। কুকুর ও বিড়ালের মাধ্যমে জলাতঙ্ক ছড়াতে পারে। তাই এসব প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ পালনকারী পোষা প্রাণীকে জলাতঙ্কের টিকা দেন না। ফলে কামড় বা আঁচড়ের শিকার হলে মানুষকে টিকা নিতে হবে। পোষা প্রাণীকে টিকার আওতায় আনা গেলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
- বিষয় :
- চিকিৎসা