ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা
ভুলের মাশুল ১৬ প্রাণ
দুই ট্রেনের সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ১৬ জনের
আবদুন নূর ও নাসির উদ্দিন, কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) থেকে ফিরে
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯ | ২৩:৩৩ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০১৯ | ২৩:৪৬
নিরাপদ বাহন হিসেবে পরিচিত ট্রেন। এই ট্রেনেই ঘটল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মুহূর্তের ভুলে ঝরল ১৬টি তাজা প্রাণ। তাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত সোমবার রাত ৩টার দিকে ব্রা?হ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দবাগ স্টেশনে উদয়ন এক্সপ্রেস ও তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। সিলেট থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল উদয়ন আর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাচ্ছিল তূর্ণা ট্রেনটি। এ দুর্ঘটনার জন্য প্রাথমিকভাবে চালককে দায়ী করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তূর্ণা নিশীথার চালক সংকেত অমান্য করায় দুর্ঘটনাটি ঘটে।
রেলের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তূর্ণা নিশীথার আধুনিক ইঞ্জিন। তাই ইঞ্জিনের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নেই। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে এরই মধ্যে পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তূর্ণা নিশীথার লোকোমাস্টার (চালক) তাছির উদ্দিন, সহকারী অপু দেব ও গার্ড আবদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। চালক পলাতক। তার সহকারীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন দুটি সরিয়ে রেললাইন মেরামতের পর গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে ঢাকা ও সিলেটের সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ চালু হয়। রেল সচিব, রেলের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ব্রা?হ্মণবাড়িয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন উদ্ধার তৎপরতায়।
নিহত ১৫ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নাম-পরিচয়হীন এক নারীর লাশ কুমিল্লায় হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। আহতদের ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হতাহতের প্রায় সবাই উদয়ন এক্সপ্রেসের যাত্রী।

হতাহতের ঘটনায় শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় রেল চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর নরসিংদী স্টেশনে ক্রসিংয়ের সময় মহানগর গোধূলি এবং চট্টলা মেইলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ট্রেনের চালকসহ ১২ জন নিহত হয়েছিলেন। ওই দুর্ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধ কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা জানা যায়নি। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যুর পর রেলের এক বিভাগ অপর বিভাগের ওপর দায় চাপায়।
যেভাবে দুর্ঘটনা :প্রত্যক্ষদর্শীরা সমকালকে জানিয়েছেন, রাত ২টা ৫৫ মিনিটে উত্তর দিক থেকে মন্দবাগ স্টেশনের এক নম্বর লাইনে প্রবেশ করে উদয়ন এক্সপ্রেস। একই লাইনে বিপরীত দিক থেকে আসছিল তূর্ণা নিশীথা। ট্রেন দুটির ক্রসিং হওয়ার কথা ছিল এই স্টেশনে। তাই উদয়ন এক্সপ্রেসকে এক নম্বর লাইন থেকে ডান পাশের লুপ লাইনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, যাতে তূর্ণা নিশীথা পাশ কাটিয়ে স্টেশন পার হতে পারে।
স্টেশন সূত্র জানিয়েছে, উদয়ন এক্সপ্রেস স্টেশনে প্রবেশের পর বিপরীত দিকের আউটারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লালবাতি জ্বলে ওঠে। কিন্তু তূর্ণা ট্রেনটি লালবাতি উপেক্ষা করে স্টেশনের হোমে (প্রবেশ মুখে) চলে আসে। ততক্ষণে উদয়ন এক্সপ্রেসের ১৬টি কোচের (বগি) ৯টি লুপ লাইনে ঢুকে যায়। বাকি সাত বগি তখনও ছিল মূল লাইনে। ঠিক সে সময় ১০ নম্বর বগিতে আঘাত করে তুর্ণা নিশীথার লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন)। লাইনচ্যুত হয় ১০ নম্বরসহ ১১ এবং ১২ নম্বর বগি। ১০ নম্বর বগি দুমড়েমুচড়ে যায়।
মন্দবাগ স্টেশন মাস্টার জাকির হোসেন চৌধুরী বলেন, তূর্ণা নিশীথাকে আউটারে থাকার সংকেত দেওয়া হয়েছিল। ট্রেনটির চালক সংকেত অমান্য করে মূল স্টেশনে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপর ট্রেনটি উদয়ন এক্সপ্রেসকে ধাক্কা দেয়।
রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, ট্রেন চলে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে। একটি ট্রেন স্টেশনে অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় সেই লাইনে আরেকটি ট্রেনের প্রবেশের সুযোগ নেই। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিপরীতমুখী ট্রেনকে থামার সংকেত দেওয়া হয়।
তদন্ত চলমান থাকায় রেলের বর্তমান প্রকৌশলীরা এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কথা বলেননি। তারা বলেন, মন্দবাগের দুর্ঘটনায় তূর্ণা নিশীথার চালকের দায় রয়েছে। স্টেশনের আউটারের পর হোমের দৈর্ঘ্য ৪৪০ গজ। আউটার লালবাতি কোনো কারণে না দেখলে হোমের বাতি দেখবে। সেখানেও ট্রেন থামানো সম্ভব ছিল। হয়তো চালক তার আসনে ছিলেন না, কিংবা তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
রেলের পরিচালক (লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ) তাপস কুমার দাস সমকালকে বলেন, তূর্ণা নিশীথায় ২৯২৩ সিরিয়ালের ইঞ্জিন রয়েছে। এ আধুনিক ইঞ্জিনগুলোতে ত্রুটি নেই। তাই ইঞ্জিনের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নেই। চালকের ভুল ছিল কি-না, তা তদন্তে জানা যাবে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী বোরহান উদ্দিন উদয়ন এক্সপ্রেসে ছিলেন। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তিনি ট্রেনের অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে তার বগি শূন্যে উঠে পড়ে। তিনি ছিটকে পড়েন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নোয়াখালীর অলিউল্লাহ জানান, তিনিও উদয়ন এক্সপ্রেসে ছিলেন। বিকট শব্দের পর ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারান। এরপর কী হয়েছে তার মনে নেই।

স্টেশন সংলগ্ন চান্দখলা গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, ঘুমে ছিলাম। দুই ট্রেনের সংঘর্ষে বিকট শব্দে বাড়ি কেঁপে ওঠে। এলাকাবাসী উদ্ধার কাজ শুরু করে। গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, দুই ট্রেনের ধাক্কায় দুর্ঘটনাস্থলের প্রায় ২০০ ফুট রেললাইনও উঠে এসেছে।
হতাহত : দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- হবিগঞ্জ সদরের বুল্লা গ্রামের ইয়াছির আরাফাত (১২), বানিয়াচং বড়বাজারের মইন আহমেদ সোহেলের শিশুকন্যা আদিবা আক্তার সোহা ও মদনমোড়ক গ্রামের আইয়ুব মো. আল-আমিন (৩০), চুনারুঘাটের পেয়ারা বেগম (৪৮) ও সুজন আহমেদ (২৪), গোয়াইনঘাটের রিপন মিয়া (২২), হবিগঞ্জ পৌর এলাকার আলী মোহাম্মদ ইউছুফ (৩২), চাঁদপুরের জাহাঙ্গীরের শিশুকন্যা মরিয়ম বেগম (৪), একই জেলার ফারজানা বেগম (৪১) ও মাইনুদ্দিনের স্ত্রী কাকলী আক্তার (৩২), চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের পশ্চিম রাজারগাঁও গ্রামের মজিবুর রহমান (৫৫) এবং তার স্ত্রী কুলসুম বেগম (৩০), নোয়াখালীর মাইজদীর রনি হরিজন (৩৫) এবং শ্রীমঙ্গলের গাজীপুরের জায়েদা খাতুন (৩০)। নিহত এক নারীর পরিচয় পাওয়া যায়নি। তার মরদেহ কুমিল্লার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় চাঁদপুরের উত্তর বালিয়ার ফারজানা নামে এক শিক্ষার্থীর।
দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে ৪১ জনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চাঁদপুরের মাইনুদ্দিনের শিশুকন্যা মাহিমার সঙ্গে থাকা তার মা ও নানির প্রথমে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে মাহিমার মা কাকলি আক্তারের খোঁজ মেলে কসবার বায়েক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোলা অস্থায়ী তথ্য কেন্দ্রের লাশের সারিতে। আর মাহিমার সন্ধান মেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. শওকত হোসেন জানান, দুর্ঘটনার পরপরই মেডিকেল টিম প্রস্তুত করা হয়। আহতদের বেশিরভাগের হাত-পা ভাঙা কিংবা মাথায় আঘাত রয়েছে। তিনি জানান, দু'জনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহ আলম জানিয়েছেন, আহতদের চিকিৎসায় পাঁচটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে বিভিন্ন স্কুলে ক্যাম্প খোলা হয়েছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয় ১২ জনকে। তাদের মধ্যে চারজন আশঙ্কামুক্ত। গুরুতর আহত বাকি আটজনকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। সিলেটের ওসমানী হাসপাতালে আছেন চারজন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমীন রহমান চৌধুরী জানিয়েছেন, আহতদের বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
উদ্ধার তৎপরতা :প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পরপরই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা হতাহতদের ট্রেন থেকে বের করে আনেন। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট উদ্ধার তৎপরতা চালায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান রাতেই ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধারকাজ তদারক করেন।
স্থানীয়রাও সহযোগিতা করেন। স্থানীয় বাসিন্দা জহির মিয়া বলেন, আহত ও স্বজনহারাদের আহাজারি শুনে তারা ঘটনাস্থলে আসেন। সাতটি পিকআপে করে গ্রামবাসী আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। যারা স্বজন হারিয়েছেন তাদের বুকফাটা কান্নায় চারপাশ ভারি হয়ে ওঠে।
রেলমন্ত্রী উদ্ধারকাজ পরিদর্শনে এসে জানান, কোনো কিছু দিয়েই এই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে রেল নিহতদের পরিবারকে এক লাখ করে টাকা দেবে। আহতরা পাবে ১০ হাজার টাকা করে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, নিহতদের দাফনের জন্য ২৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টেশন ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, আট ঘণ্টা লাইন বন্ধ থাকায় কোনো ট্রেন বাতিল হয়নি। তবে আটটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের পর ছেড়েছে।
তদন্ত কমিটি :দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেল মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে। আরেকটি কমিটি গঠন করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে কমিটিগুলোকে। রেল মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে।
রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেছেন, প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনা রোধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেলের মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামানও একই কথা জানিয়েছেন।
শোক :নিহতের ঘটনায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও শোক প্রকাশ করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকরা। শোক জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সংগঠনও।
