ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের মামলায় চার্জশিট, অভিযুক্ত ৩৭ জন

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের মামলায় চার্জশিট, অভিযুক্ত ৩৭ জন
×

ফাইল ছবি

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৯:২৪

নারায়ণগঞ্জের তল্লায় মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বৃহস্পতিবার চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। এ ঘটনায় মোট ৩৭ জন আসামি হচ্ছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে আটজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।

সরকারি পদ-পদবি থাকায় ওই আটজনকে চার্জশিটভুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে তাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। তবে এরই মধ্যে ২৯ জন চার্জশিটভুক্ত হয়েছেন।

ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার জন্য ডিপিডিসি, তিতাস ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির অবহেলা ও উদাসীনতার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। তাই অভিযুক্তদের মধ্যে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির নামও আছে। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার তল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে অগ্নিকাণ্ডে ৩৪ জন মুসল্লি অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। পরে এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত শুরু করে সিআইডি। ওই দুর্ঘটনার পরপরই গ্যাসলাইন ঘিরে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার তথ্য সামনে আসতে থাকে।

তদন্তে উঠে আসে, মসজিদ কমিটি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, উদাসীনতা, সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা, কারিগরি দিক বিবেচনা না করে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ঝুঁকিপূর্ণভাবে লাগানো, গ্যাসের উপস্থিতি টের পেয়েও মুসল্লিদের জীবনের নিরাপত্তার কথা না ভেবে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) মিটার রিডিং কালেক্টর ও ইলেকট্রিশিয়ানদের মসজিদে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণভাবে মসজিদের ভেতরে বিদ্যুতের যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেখানকার গ্যাসের দায়িত্ব থেকেও অবহেলা করেছেন। তারা গ্যাসলাইনের সঠিক তদারকি করেননি। এ ছাড়া পাইপ লিকেজের মেরামতও করা হয়নি। গ্যাসলাইন ঝুঁকিপূর্ণভাবে স্থানান্তর ও স্থাপন করার কারণে ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, দুর্ঘটনার তিন মাস আগে থেকেই মসজিদের পাশে তিতাস গ্যাসের পাইপের লিকেজ থেকে গ্যাস বের হয়। ওই গ্যাস মসজিদের ভেতরে জমতে থাকে। বাধাহীনভাবে গ্যাস উদ্‌গিরণ হয়ে মসজিদ একটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়। দুর্ঘটনার সাত-আট দিন আগে গ্যাসের তীব্রতা বাড়লে মুসল্লিরা বিষয়টি মসজিদ কমিটিকে জানান। তবে মসজিদ কমিটি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ঘটনার দিন এশার নামাজের সময় বৈধ বিদ্যুৎ লাইন চলে গেলে ম্যানুয়াল চেঞ্জওভারের মাধ্যমে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন চালু হলে বিদ্যুতের স্পার্ক হয়। তখন বিদ্যুতের স্পার্ক ও মসজিদে জমে থাকা গ্যাসের সমন্বয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

আসামি যারা : মসজিদে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন- তিতাসের ফতুল্লা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম, উপব্যবস্থাপক মাহমুদুর রহমান রাব্বি, সহকারী প্রকৌশলী এসএম হাসান শাহরিয়ার, সহকারী প্রকৌশলী মানিক মিয়া, সিনিয়র সুপারভাইজার মুনিবুর রহমান চৌধুরী, সিনিয়র উন্নয়নকারী আইউব আলী, হেলপার হানিফ মিয়া ও কর্মচারী ইসমাইল প্রধান। তাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্য সিআইডি অনুমতি চেয়েছে।

এ ছাড়া এরই মধ্যে চার্জশিটভুক্ত হয়েছেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল গফুর মিয়া, সামসুদ্দিন সরদার এবং শামসু সরদার, শওকত আলী, অসিম উদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল, নাঈম সরদার, তানভীর আহমেদ, আল আমিন, আলমগীর সিকদার, মো. আল আমিন, সিরাজ হাওলাদার, নেওয়াজ মিয়া, নাজির হোসেন, আবুল কাশেম, আব্দুল মালেক, মো. মনিরুল, স্বপন মিয়া, আসলাম আলী, আলী তাজম মিল্ক্কী, মো. কাইয়ুম, মামুন মিয়া, দেলোয়ার হোসেন, বশির আহমেদ হৃদয়, মো. রিমেল, আরিফুর রহমান, মোবারক হোসেন ও রায়হানুল ইসলাম।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার নাসির উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই মামলার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করা হলো। এই মামলার তদন্তে দুর্ঘটনার পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল, তা উঠে এসেছে। এই মামলায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে আটজন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে গ্রেপ্তার সবাই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল গফুর সমকালকে বলেন, সিআইডির এই অভিযোগপত্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করবেন তিনি।

মামলা : মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছিল। এজাহারে বলা হয়- অবহেলার কারণে এ ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ফতুল্লা মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন এসআই হুমায়ুন কবির। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিরা দায়ী বলে উল্লেখ করা হয়। অবহেলার জন্য তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, ডিপিডিসি ও মসজিদ কমিটি দায়ী থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশসহ অন্তত ছয়টি সংস্থা পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে।

আরও পড়ুন

×