চট্টগ্রামেও টিসিবির কারসাজি
ধনীর পেটে যাচ্ছে গরিবের পেঁয়াজ
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৫
দোলন বড়ূয়া। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তালিকাভুক্ত ডিলার।
টিসিবির গুদাম থেকে এক হাজার কেজি পেঁয়াজ নিয়ে বায়েজিদ এলাকায় যান তিনি
দুপুর ১২টায়। সেখানে ঘণ্টা দুয়েক পেঁয়াজ বিক্রি করে ১৭৫ কেজি পেঁয়াজ তিনি
বিক্রি করে দেন অক্সিজেন মোড়ের মুদি দোকান জাহাঙ্গীর স্টোরে। গরিবের জন্য
টিসিবি প্রতিকেজি পেঁয়াজের দাম রেখেছিল ৪৫ টাকা। দোলন বড়ূয়া সেই পেঁয়াজ
মুদি দোকানে বিক্রি করে দিলেন ৭৫ টাকায়। বায়েজিদ থানা পুলিশ সেই দোকানে
হানা দিয়ে হাতেনাতে ধরেছে দোলন বড়ূয়াসহ পেঁয়াজ বিক্রির সঙ্গে জড়িত চার
হোতাকে। দোলন বড়ূয়ার ঘটনাটি সোমবারের। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর তাই টিসিবির
খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রির বিষয়টি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছে সমকাল। গতকালও
বিভিন্ন পয়েন্টে পাওয়া গেছে ব্যাপক অনিয়ম। অনুসন্ধানে মিলেছে, প্রতি পাঁচ
সেকেন্ডে এক কেজি পেঁয়াজ বিক্রির অবিশ্বাস্য তথ্য।
টিসিবির ডিলার মোহাম্মদ মোবারকের মালিকানাধীন বিসমিল্লাহ স্টোর এক হাজার
কেজি পেঁয়াজ নিয়ে পাসপোর্ট অফিসের সামনে আসে সকাল সোয়া ১১টায়। দুপুর সোয়া
২টায় এক হাজার কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করে ফেলেছে বিসমিল্লাহ স্টোর। অথচ এক
কেজি পেঁয়াজ মাপা, প্যাকেট করা ও টাকা নিতে যদি এক মিনিট সময়ও হিসাব করা হয়
তবে এক হাজার কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করতে তাদের সময় লাগার কথা কমপক্ষে ১৬
ঘণ্টা। এ প্রতিষ্ঠান পেঁয়াজ বিক্রি শেষ করেছে মাত্র তিন ঘণ্টায়। এ হিসাবে
প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে এক কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করেছে তারা; যা অবিশ্বাস্য।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের বিপরীত পাশে তিনটি মুদি দোকানের ৯
কর্মচারী ছিলেন তাদের পেঁয়াজের গাড়ির লাইনে। তাদের প্রত্যেককে তিন কেজি করে
২৭ কেজি পেঁয়াজ দেওয়া হয়েছে ৪৫ টাকা দরে। এ পেঁয়াজ দোকানে নিয়ে তারা
বিক্রি করছেন ১৬০ টাকা করে। আবার আগ্রাবাদে সিজিও বিল্ডিংয়ের সামনে থাকা
টিসিবির ট্রাক থেকে পেঁয়াজ নিয়ে গেছেন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুই নেতা। পাঁচ
কেজি করে তারা দুইজন নিয়েছেন ১০ কেজি পেঁয়াজ। লাইনে না দাঁড়িয়ে তারা যখন
এসব পেঁয়াজ নিচ্ছিলেন তখনও লাইনে ছিলেন অন্তত শখানেক মানুষ। ঝামেলা এড়াতে
কোনো বাধা ছাড়াই তাদের এ পেঁয়াজ দিয়েছে টিসিবির ডিলার মেসার্স ইউছুফ স্টোর।
গরিবের জন্য দেওয়া টিসিবির পেঁয়াজ এভাবেই নয়ছয় হচ্ছে চট্টগ্রামে। কেউ
সরাসরি দোকানে বিক্রি করে দিচ্ছেন। কেউবা দোকানের কর্মচারীদের লাইনে দাঁড়
করিয়ে নিয়মের বাইরে বেশি পেঁয়াজ দিচ্ছেন। আবার কেউবা তাদের পরিচিত জনকে
একসঙ্গে বেশি পেঁয়াজ দিয়ে দায়িত্ব সারছেন। অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে
দাঁড়িয়েও গরিবরা পাচ্ছে না এক কেজি পেঁয়াজ।
টিসিবির পেঁয়াজ খোলাবাজারে বিক্রি ঠিকমতো মনিটর করা যাচ্ছে না বলে স্বীকার
করেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান ও উপ-ঊর্ধ্বতন কার্যনির্বাহী জামাল উদ্দিন
আহমেদ। তিনি বলেন, 'ডিলারদের যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই প্রতিদিন পেঁয়াজ
দিচ্ছি ট্রাকে। তারা নিয়ম মেনে গরিবদের কাছে বিক্রি করছে কি-না সেটি আর
মনিটর করতে পারছি না আমরা। আমার অফিসে আমিই একমাত্র অফিসার। প্রথম শ্রেণি ও
দ্বিতীয় শ্রেণির আর কোনো কর্মকর্তা নেই। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের হিসাবে
আনলেও এ সংখ্যা মাত্র সাত। এই অল্প সংখ্যক মানুষকে দিয়ে এখন প্রতিদিন ১২
টন পেঁয়াজ ডিলারদের দিতে হচ্ছে। মনিটর করার মতো কোনো জনবলই নেই আমার।'
খোলাবাজারের পেঁয়াজ দোকানে বিক্রি করে দেওয়া, মুদি দোকানের কর্মচারীদের
লাইনে দাঁড় করিয়ে বাড়তি পেঁয়াজ দেওয়া ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাদের বাধা
ছাড়া পেঁয়াজ দিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা
ডিলারের জামানত বাজেয়াপ্ত ও লাইসেন্স বাতিল করব। টিসিবির যে ডিলার মুদি
দোকানে সাত বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি করে দিয়েছে তার লাইসেন্স বাতিল করার
প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। টিসিবির পণ্য যথাযথভাবে বিক্রি হচ্ছে কি-না সেটি
ভোক্তা অধিকার কিংবা জেলা প্রশাসনও তাদের মতো করে মনিটর করতে পারে। জনবল না
থাকায় আমরা এক্ষেত্রে অসহায়।'
টিসিবির পণ্য বিক্রির সময় ডিলারের উপস্থিতি থাকা বাধ্যতামূলক। একজন যাতে এক
কেজির বেশি পেঁয়াজ না পায় সেই বিষয়টিও তদারকি কথার কথা ডিলারের। বরাদ্দ
করা সব পেঁয়াজ বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত তা লাইনে থাকা মানুষের কাছে বিক্রি
করতেও দায়বদ্ধ তারা। এসব নিয়মের কোনোটিই দেখা যায়নি সরেজমিনে ঘুরে। বায়েজিদ
থানার সামনেই পেঁয়াজ বিক্রির কথা ছিল টিসিবির ডিলার জেনারেল ট্রেডিংয়ের।
তারা পেঁয়াজ বিক্রি করেছে আরও অন্তত দুই কিলোমিটার দূরে। জেনারেল
ট্রেডিংয়ের মালিক সৈয়দ মো. মারুফকে পেঁয়াজ বিক্রির সময় গাড়ির আশপাশে দেখা
যায়নি। পরে তাকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, 'ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আমি ব্যাংকে
এসেছি। কাজ সেরে সেখানে যাব।' দুপুর ২টায় তার ট্রাকে আরও ২০০ কেজি পেঁয়াজ
অবশিষ্ট ছিল বলে জানান তিনি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এই পেঁয়াজ বিক্রি শেষ হয়ে
যাবে বলে জানান তিনি। তার এ কথা সত্য ধরলে তিনিও এক হাজার কেজি পেঁয়াজ
বিক্রি করেছেন মাত্র তিন ঘণ্টায়। দুপুর ১২টায় শুরু করে ৩টার মধ্যে শেষ হলে
তিনিও প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন পাঁচ সেকেন্ডে।
পাহাড়তলী থানার সামনে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি করেছে ডিলার নাজিম স্টোর।
এখানেও ডিলারের দেখা মেলেনি। এক কেজির স্থলে কাউকে কাউকে পাঁচ কেজি পেঁয়াজও
দিতে দেখা গেছে নাজিম স্টোরের কর্মচারীদের। বিষয়টি স্বীকার করে ডিলার মো.
নাজিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'কেউ কেউ মিলাদুন্নবীর কথা বলে অতিরিক্ত পেঁয়াজ
নিচ্ছেন। ধর্মীয় বিষয় বলে তাদের বাধাও দিতে পারি না।' কিন্তু গরিবের জন্য
এক কেজি বরাদ্দ থাকা পেঁয়াজ অন্যকে পাঁচ কেজি দেওয়া ঠিক হচ্ছে কি না-
জিজ্ঞেস করলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ট্রাকের সঙ্গে না থাকা
প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমি একটু আগে দুপুরের খাবার খেতে বাসায় এসেছি। বিকেল
৪টায়ও আমার ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে।' কিন্তু বিকেল পৌনে ৪টায় পাহাড়তলী
থানার আশপাশে গিয়ে দেখা মেলেনি টিসিবির পেঁয়াজ বোঝাই কোনো গাড়ি। স্থানীয়
দোকানি আবদুর রহমান বলেন, 'ঘণ্টা তিনেক আগে পেঁয়াজ বিক্রি করে টিসিবির গাড়ি
চলে গেছে। প্রতিদিন দুই-তিন ঘণ্টার বেশি থাকে না তারা।' অভিন্ন কথা বলেছে
ডবলমুরিং এলাকার বাসিন্দারাও।
ডবলমুরিং পাসপোর্ট অফিসের সামনে পেঁয়াজ বিক্রির দায়িত্বে থাকা বিসমিল্লাহ
স্টোরের মালিক মোহাম্মদ মোবারক বলেন, 'পেঁয়াজের মান ভালো হওয়ায় তিন ঘণ্টার
মধ্যে শেষ হয়ে গেছে বিক্রি। গাড়িতে চার কর্মচারী থাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করতে
বেশি সময় লাগছে না।' পছন্দের মানুষকে তিন থেকে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ দেওয়া
অনিয়ম কি না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'পরিচিত কেউ থাকলে তো আর ফিরিয়ে দিতে
পারি না। তারপরও চেষ্টা করছি লাইনে থাকা মানুষকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে।'
বিকেল ৪টায় আগ্রাবাদ সিজিও বিল্ডিংয়ের সামনে থাকা টিসিবির পেঁয়াজের গাড়ি
ঘিরে ছিল অর্ধশত মানুষ। বেশিরভাগ মানুষই ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র। কেবল এ গাড়ির
সঙ্গে দেখা গেছে টিসিবির ডিলার মোহাম্মদ ইউছুফকে। ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে
মাত্রাতিরিক্ত পেঁয়াজ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি কোনো মন্তব্য জানাতে অস্বীকৃতি
জানান।
জানা গেছে, পেঁয়াজের উত্তাপ থেকে গরিবদের কিছুটা রক্ষা করতে চট্টগ্রামে ১৯
নভেম্বর থেকে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে টিসিবি। শুরুতে ছয় ডিলারকে
ছয় টন পেঁয়াজ খোলাবাজারে বিক্রি করতে দেন তারা। ৩০ নভেম্বর থেকে এর পরিমাণ
বাড়িয়ে দিনে ১০ টন করা হয়। ২ ডিসেম্বর থেকে আরেক দফা বাড়িয়ে পরিমাণ
নির্ধারণ করা হয় দিনে ১২ টন। এখন ১২ জন ডিলার নগরীর ১২টি পয়েন্টে প্রতিদিন
নিয়ে যাচ্ছে ১২ টন পেঁয়াজ। টিসিবির প্রধান জানান, নগরীর ১২ জন ডিলারের
প্রত্যেককে সংশ্নিষ্ট থানার সামনে থেকে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বলেছেন তারা।
থানা এলাকার বাইরে আগ্রাবাদের সিজিও বিল্ডিং, জামালখানের প্রেসক্লাব ও
দামপাড়ার ওয়াসা মোড়কে স্পট ঠিক করা হয়। অন্য স্পটগুলো হচ্ছে খুলশী থানা
সংলগ্ন জিইসি মোড়, কোতোয়ালি থানার মোড়, বায়েজিদ থানার মোড়, হালিশহর থানার
মোড়, পতেঙ্গা থানার মোড়, আকবরশাহ থানার মোড়, বন্দর থানার মোড়, ডবলমুরিং
থানার মোড় ও ইপিজেড থানার মোড়। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায়ও
কোতোয়ালি থানার আশপাশে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রির কোনো গাড়ি দেখা যায়নি।
হালিশহর থানার সামনেও বিকেলে ছিল না টিসিবির কোন গাড়ি। অথচ এসব গাড়ি পেঁয়াজ
বিক্রি শুরুই করেছে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে। সকাল ১০টায় বিক্রি
শুরুর কথা থাকলেও ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে ডিও ইস্যু করে ট্রাকে পণ্য তুলতে
গিয়ে ঘণ্টা দেড়েক সময় চলে যাচ্ছে। এরপর স্পটে আসতে আরও অন্তত আধাঘণ্টা সময়
লাগছে। বেশিরভাগ গাড়িই বিক্রি শুরু করছে দুপুর ১২টায়। আবার বিক্রি শেষও করে
ফেলছে বেলা ৩টায়।
গড়ে তিন ঘণ্টায় এক হাজার টন পেঁয়াজ বিক্রি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে
মন্তব্য করেন ক্যাবের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, 'এক কেজি
পেঁয়াজ মাপা থেকে শুরু করে টাকা নেওয়া পর্যন্ত কম করে হলেও এক মিনিট সময়
লাগে। তিন ঘণ্টায় যারা এক হাজার কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করছেন তারা প্রতিকেজি
পেঁয়াজ বিক্রি করছেন পাঁচ সেকেন্ডে। এখান থেকেই নিশ্চিত যে টিসিবির পেঁয়াজ
যথাযথভাবে যাচ্ছে না গরিবের কাছে। কেউ খোলাবাজারে এ পেঁয়াজ দোকানে বিক্রি
করে দিচ্ছেন। না হয় পরিচিতজনের কাছে বেশি করে বিক্রি করছেন।'
এদিকে টিসিবির পেঁয়াজ দোকানে বিক্রি করে দেওয়া ডিলার দোলন বড়ূয়ার বিরুদ্ধে
মামলা করেছে বায়েজিদ থানা পুলিশ। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রিটন সরকার জানান,
বিশেষ ক্ষমতা আইনে চার জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
- বিষয় :
- পেঁয়াজ
