ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে কড়া সম্প্রদায়ের লাপোল

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে কড়া সম্প্রদায়ের লাপোল
×

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে লাপোল কড়া - সমকাল

মতিউর রহমান সেলিম, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২২ | ০৬:৫৮ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২২ | ০৬:৫৮

আদিবাসী কড়াদের প্রথম ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসেছেন। তার নাম লাপোল কড়া। লাপোলের আগে কড়া সম্প্রদায়ের কেউ মাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরোয়নি। নানা প্রতিকূলতার কারণে কড়া সম্প্রদায়ের মাত্র ২৪টি পরিবার এখনো বাংলাদেশে টিকে আছে। শ'খানেক মানুষের এই সম্প্রদায়টি অবশ্য 'বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর' একটি। অবহেলিত কড়া সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াতে উচ্চ শিক্ষার লড়াই চলছে লাপোলের। ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফমেন্স স্টাডিজ বিভাগে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের স্মাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তির জন্য বৃহস্পতিবার ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেবেন তিনি।

বাংলাদেশে প্রায় বিলুপ্তির পথে আদিবাসীদের কড়া সম্প্রদায়। কড়া সম্প্রদায়ের বসবাস দিনাজপুরের বিরল উপজেলায়। কড়াদের দেড় শতাধিক পরিবারের মধ্যে বিরল উপজেলায় ২৪ পরিবার এবং সদর উপজেলা ঘুঘুডাঙ্গায় ৪টি পরিবারসহ বাংলাদেশে টিকে আছে মাত্র ২৮টি পরিবার। নানা টানাপড়েনের কারণে শিক্ষা-দীক্ষার দিক দিয়ে অন্যান্য আদিবাসীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে কড়া সম্প্রদায়।

ওই সম্প্রদায়দের একজন বিরল উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের রাঙ্গন গ্রামের রতন কড়ার ছেলে লাপোল কড়া। লাপোলই প্রথম গেল বছর এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য লড়ছেন। ওই সম্প্রদায়ের ১০৪ জন সদস্যের মধ্যে বিরল লাপোল স্থানীয় রাঙ্গন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সমাপনী, হালজায় উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও বোর্ড হাট মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রথম ধাপ পেরিয়েছে লাপোল। আগামীকাল তার ব্যবহারিক পরীক্ষা। ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে বুধবার সকালেই দিনাজপুর থেকে কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছান। মাদল হাতে ভর্তিচ্ছু লাপোল ঘুরে বেড়ান নাট্যকলা বিভাগসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। মাদলহাতে নাট্যকলা বিভাগের সামনে ঘুরতে থাকা লাপোল নজর কাড়েন সবার। নতুন স্বপ্নের বুননে আসা লাপোলের সঙ্গে নাট্যকলা বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয়।

লাপোল কড়া বলেন, 'আমি এইচএসসি পাস করার আগ পর্যন্ত আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন কৃষ্ণ মামা। ভূমিদস্যুদের সঙ্গে লড়াই করে আমাদের গ্রামটাকে রক্ষা করতে গিয়ে দশম শ্রেণির চৌকাঠ পেরোতে পারেননি কৃষ্ণ মামা। কিন্তু তিনিই প্রেরণা হয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার। কৃষ্ণ মামার অনুপ্রেরণায় প্রতিকূল অবস্থাকে উপেক্ষা করে প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে পড়ালেখার প্রতি মনযোগী হয়েছি। অনুধাবন করেছি- অবহেলিত, নির্যাতিত কড়া সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াতে শিক্ষা আর উচ্চশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।'

কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিশিষ্ট লেখক মেহেদী উল্লাহ বলেন, অনগ্রসর আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কড়া সম্প্রদায়ে শিক্ষা দীক্ষার হার কম। তবে যে কোনো ধরনের জাতিসত্তার পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মানুষেরই শিক্ষার মৌলিক অধিকার থাকে। অনেকে নানা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে পিছিয়ে যায়। তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে সংকটগুলো থাকে, সেগুলো দূরীকরণের মাধ্যমে তাদেরকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে। যদি কেউ সকল প্রতিকূলতা প্রতিহত করে নিজের স্বাতন্ত্র, সংস্কৃতি রক্ষা করতে চায়, তবে অবশ্যই তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। এতে তার সংস্কৃতি টিকে থাকবে। জাতিসত্তা ও জনগোষ্ঠীগুলো পিছিয়ে আছে শিক্ষার হারে। তারা যদি শিক্ষায় এগিয়ে আসে তাহলে রাষ্ট্র উপকৃত হবে।

আরও পড়ুন

×