বাজার ব্যবস্থা গড়ে না উঠায় উদ্যম হারাচ্ছে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরনাঙ্গুলিয়ায় সুরমা বেগম কৃষি জমিতে কাজ করছেন
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২০ | ০২:৪৯ | আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২০ | ০৫:০৯
একচিলতে জমিও অনাবাদি নেই। অথচ মাত্র এক দশক আগে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে লবণাক্ততার কারণে চাষাবাদ হতো না বললেই চলে। নোনা মাটির ওই সব চরেই এখন যতদূর চোখ যায়, ততদূর সবুজ আর সবুজ। কৃষিতে ঝুঁকছেন চরের মানুষ। চাষাবাদে অবশ্য পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি ভূমিকা রাখছেন, তেমনি একজন সুরমা বেগমের সঙ্গে আলাপ হলো চরনাঙ্গুলিয়ায়। হাতিয়া উপজেলা থেকে নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে তিনি এখন এখানে চসবাস করছেন। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে ভূমিহীন হিসেবে বরাদ্দ পাওয়া দেড় একর জমিতে সুরমা শুরু করেন সর্জন পদ্ধতিতে চাষাবাদ। স্থানীয় একটি এনজিও সংস্থা থেকে লোন ও নিজের কিছু টাকায় প্রথমে স্বল্প পরিসরে গরুর খামার, পুকুরে মাছ চাষ ও সবজি চাষ করেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে সুরমা এখন এলাকায় নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। সুরমার পুকুরে হচ্ছে মাছ চাষ, পানিতে সাঁতার কাটছে হাঁস। তার পাড়ে শিম, শসা, বরবটি, করলা, লাউ, কুমড়া, ঝিঙে, পটোলের চাষ হচ্ছে। বাড়ির পাশের জলাশয়ের পানির ওপর গড়া মাচায় লতানো সবজি চাষ চলছে। সুরমা বললেন, ‘নিজে উপার্জন করতে কার না ভালো লাগে। ছোট পরিসরে খামার করছি। ডেইরি ফার্মে প্রতিদিন ৩৬ টাকা লিটার করে ৫-৬ লিটার দুধ বিক্রি করি। মুরগির ডিম ও হাঁসের ডিম বিক্রি করি। প্রচুর সবজি ও মাছ পাচ্ছি। তবে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, এত উৎপাদনের পরও সঠিক দাম পাচ্ছি না। বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য যেতে পারি না। বাড়িতে লোক এসে পন্য নিয়ে যায়। কারণ স্থানীয়ভাবে নারীদের জন্য আলাদা নারীবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। বড় পরিসরের কৃষিকাজে বাজারজাতকরণে তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। সামাজিক প্রতিন্ধকতা তো আছেই অনেক ক্ষেত্রেই থাকে পারিবারিক অসহযোগিতা।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান বাড়ছে নারী উদ্যোক্তাদের। শহরের পাশাপাশি এখন গ্রামেও বাড়ছে নারী উদ্যোক্তা। এতে যেমন আত্মকর্মসংস্থান হচ্ছে, তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে কাজ করছেন। বর্তমানে জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশের কিছুটা বেশি। কিন্তু বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অবদান স্বীকার করলে এই হার দাঁড়ায় ৪০ শতাংশের ঊর্ধ্বে। বর্তমানে কৃষি খাতে নিয়োজিত আছেন ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী। গত এক যুগে বাংলাদেশে কৃষির নারীকরণ হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মতোই দেশের কৃষি খাত বা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা। গত ১০ বছরে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। আর পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে দুই শতাংশ। খাদ্যনীতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৯০ শতাংশ বাড়িতে মুরগি পালন নিয়ন্ত্রণ করেন নারী। ছাগল ও গরু পালনে নারীদের নিয়ন্ত্রণ ৫৫ শতাংশ।
তবে গ্রামীণ নারীদের জন্য বাজার ব্যবস্থা গড়ে না উঠায় তারা উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি হতে পারছেন না। গ্রামীণ অর্থনৈতিতে নারীর অবদান অনস্বীকার্য হলেও মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্মে মেলে না তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য। আবার নারীবান্ধব না হওয়ায় স্থানীয় বাজারে নিজেদের পণ্য বিক্রিও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তারা বলছেন, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই পারে প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তাদের মূল বাজার ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করতে। বাজারে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাড়বে নারীদের অংশগ্রহণ।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বললেন, উৎপাদিত পণ্য বিপণনে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন। বিপণন ব্যবস্থায় নারীকে সম্পৃক্ত করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। নারীরা তাদের পণ্য নিয়ে পুরুষের সঙ্গে দর-কষাকষি করছেন, এটা এখনো সমাজ মেনে নিতে পারে না।
উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডব্লিউইএবি) সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, ব্যাংকঋণ পেতে নারী উদ্যোক্তাদের যেসব সমস্যা ছিল, তা কিছুটা কমে এসেছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পণ্য বাজারজাত। এ জন্য সরকারকে সহায়তা করতে হবে। পুরুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসকেএস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল আহমেদ লিটন বলেন, গ্রামীণ নারীদের আগ্রহ থাকলেও উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগের অভাবে তারা মূল বাজারের সাথে যুক্ত হতে পারেন না। দক্ষতা থাকা স্বত্তেও তারা জানতেন না কিভাবে সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয়-উপার্জন করা যায়, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায়। এই কর্মসূচির আওতায় নারীদের বাজার ও ব্যাংকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে দেয়া হয়েছে। তবে এখনো আরো অনেক কিছু করার আছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
পুরুষ ব্যবসায়ীদের দখলে মহিলা মার্কেট
মার্কেটের নাম ‘মহিলা মার্কেট।’ ক্রেতা-বিক্রেতার সবাই নারী থাকার কথা। পুরুষরা ক্রেতা হিসেবে এলেও সঙ্গে পরিবার নিয়ে আসার কথা। কিন্তু বাস্তবে পুরুষ ব্যবসায়ীদের দখলে দেশের সব মহিলা মার্কেট। গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের মূল বাজার ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করতে নানা সময়ে নেওয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রকল্প নির্ভর এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে তেমন ফল বয়ে আনেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে ২০০১ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ৮ বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প হাতে নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কিন্তু নানা কারণে তা দেখেনি সাফল্যের মুখ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক কৃষিবিদ হামিদুর রহমান বলেন, প্রকল্পটির নাম ছিল নর্থ-ওয়েস্ট ক্রপ ডাইভারসিফিচাশন প্রজেক্ট। নারী-পুরুষ মিলিয়ে আমাদের যে প্রায় ৭টি গ্রোথ সেন্টারে কৃষকের বাজার একটা কর্ণার তৈরি করা হয় এবং সেখানে একটি দোকান মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত হবে, সেই ধারণাটাও সেখানে পরীক্ষা করা হয়।

গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ অর্থবছর পর্যন্ত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর সারাদেশের সব উপজেলায় তিনটি করে মার্কেট তিনটি নির্মাণ করে। ২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময় মার্কেটগুলো চালু করা হয়। নারীদের মধ্যে দোকান বরাদ্দ দেয়ার কথা থাকলেও তা শুরুতেই মানা হয়নি। নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিটি দোকানঘর বরাদ্দপ্রাপ্ত নারী ছাড়া কোনো পুরুষ পরিচালনা করতে পারবে না। উপজেলা হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি দোকানের প্রতি বর্গফুট হিসাবে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। প্রাপ্ত ভাড়ার শতকরা পাঁচভাগ সরকারকে ভূমি রাজস্ব খাতে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে। ১৫ ভাগ মহিলা মার্কেটের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হবে। বাকি ৮০ ভাগ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা পৌর পরিষদের তহবিলে জমা হবে। কোনোভাবেই বরাদ্দ পাওয়া মহিলা এ দোকান অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন না।
মার্কেটগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নীতিমালায় সবকিছু উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এসবের কিছুই নেই। নারীকে স্বাবলম্বী করার সরকারের এ উদ্যোগ এলজিইডি কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের চরম উদাসীনতায় মার্কেটগুলো নারীর কাছ থেকে বেহাত হয়ে গেছে। শুরু থেকেই নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বরাদ্দ দেয়ার কারণে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলাপাড়া পৌর শহরের মহিলা মার্কেটের দোকানগুলো অপেশাদারি একশ্রেণীর প্রভাবশালী তাদের নামে বরাদ্দ নিয়ে সাবলেট দিয়েছে। ওইসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে মহিলা মার্কেট কথাটি পর্যন্ত লেখা নেই। এমনকি পৌর শহরের মহিলা মার্কেটটির দক্ষিণ দিকে তোলা হচ্ছে বারান্দা ঘেঁষে স্থাপনা।
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা কার্যালয় সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানাযায়, বুড়িরবাজার মহিলা বিপণিবিতানে রয়েছে আটটি দোকান। এখানকার অধিকাংশ দোকান প্রায়ই বন্ধ থাকে। এর মধ্যে একটি দোকানে একজন নারী দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছেন। আর বাকি সাতটি দোকান রয়েছে পুরুষদের দখলে।
কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে নির্মিত অত্যাধুনিক মহিলা মার্কেট দীর্ঘ ১৭ বছরেও বরাদ্দ দিতে পারেনি উপজেলা প্রশাসন। নির্মাণের পাঁচ বছরেও চালু হয়নি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শোভাগঞ্জ বাজারে নির্মিত মহিলা মার্কেট। এ ব্যাপারে স্থানীয় চেয়ারম্যান কনক কুমার গোস্বামী বলেন, মহিলা মার্কেটটি সুবিধাজনক স্থানে নির্মাণ না হওয়ায় কেউ বরাদ্দ নিচ্ছে না।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে তিনটি মার্কেট যেন নামেই মহিলা মার্কেট। নারী ব্যবসায়ী না থাকার অজুহাতে তাদের নামে বরাদ্দ নিয়ে এক যুগ ধরে ব্যবসা করছেন পুরুষরাই। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার দুটি মহিলা মার্কেট পুরুষের দখলে।
স্থানীয় নারী উদ্যোক্তারা বলছেন, এ মার্কেট মহিলাদের নামে আছে কাজে নেই। নারীরা সেলাইসহ ক্ষুদে দোকান পরিচালনা করছেন। কিন্তু তাদের নিজস্ব দোকানপাট নেই। ওইসব নারীদের মধ্যে বরাদ্দ দেয়া হলে সরকারের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হতো। আবার অনেক প্রশিক্ষিত মহিলা রয়েছেন যাদেরকে ওই কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হলে সরকারের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হতো।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
গ্রামীণ নারীদের বাজার ব্যবস্থা শক্তিশারী করতে সরকার নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। ‘দেশব্যাপী গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৪৯১ উপজেলায় ১ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল বিশিষ্ট গ্রামীণ বাজার নির্মিত হচ্ছে। এসব উপজেলায় কমপক্ষে একটি করে তিনতলা বিশিষ্ট ৫২০টি বাজার তৈরি করা হচ্ছে। যার আয়তন চার হাজার থেকে ১০ হাজার বর্গফুট পর্যন্ত। গ্রাম পর্যায়ে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি, গ্রামীণ বাজার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষি ও অকৃষি পণ্যের বাজারজাত সুবিধায় এগুলো নির্মিত হচ্ছে। প্রতিটা বাজারে নারীদের জন্য থাকছে আলাদা ফ্লোর, যেখানে নারীরা উৎপাদিত পণ্য কেনা-বেচা করতে পারবেন। গুলোর বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত।
সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রী ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, গ্রামীণ বাজারে নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা থাকবে। নারীরা নিজেরা প্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটা ছাড়াও উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। নারীরা আর ঘরে বন্দী থাকবে না, বাইরে বের হবে। বাজারে এক নারী অন্য নারীরর সঙ্গে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও শেয়ার করতে পারবেন এই বাজারে।
তিনি আরও বলেন, দেশের গ্রামীণ অবকাঠমোর উন্নয়ন হলেও তা সার্বিকভাবে সন্তোষজনক নয়। এরফলে গ্রামীণ হাট-বাজারের পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না কৃষক ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে স্বল্প দামে কৃষকদের পণ্য বিক্রি করতে হয়। গ্রাম পর্যায়ে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্যই এই গ্রামীণ বাজার।
সফল উদ্যোগ
নারীবান্ধব বাজার নিশ্চিতে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নিয়েছে নানা পদক্ষেপ। সম্প্রতি শেষ হয়েছে অ্যাকশন এইডের তেমনই একটি প্রকল্প। একশনএইড বাংলাদেশে-এর ‘মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন (এমএমডব্লিউডব্লিউ)’ প্রকল্প বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় যাতে নারী উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা সুচারু রূপে এবং নির্দ্বিধায় পরিচালনা করতে পারেন তার জন্য কাজ করে আসছে। প্রকল্পের চার বছরের শেষ পর্যায়ে এসে নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্কেট লিটারেসি, ব্যবসা ও হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি পুষ্টি এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে নারী উদ্যোক্তাদের তথা কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতন করা হয়েছে। একইসাথে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ও সরকারি সেবাসমূহের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করিয়ে দেয়া হয়েছে যাতে করে প্রয়োজনে সেবা প্রাপ্তির বিষয়সমূহ নিশ্চিত হয়। জাতীয় কলোকিয়ামটি একই ধরনের কাজ করা সংগঠনগুলোর সাথে বাজার ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী এক্টরদের সাথে সমন্বয় সাধন এবং শিখন বিনিময়ের মাধ্যমে সমঝোতার লক্ষ্যে আয়োজন করা হয়।

এ প্রকল্পে সুফল পেয়েছেন বহু নারী। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ির রাজেনা বেগম স্বামী মো. সাদা মিয়াকে নিয়ে একুশ বছর সংগ্রাম করে এখন সফল নারী উদ্যোক্তা। পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ৪০ শতাংশ জমির অর্ধেকটা ঘরের জন্য রেখে বাকী অর্ধেকটায় শাকসবজির চাষ নিয়ে তার সংগ্রামের শুরু। কিন্তু আধুনিক উৎপাদন কম ছিল। পাশাপাশি বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে কোন ধারণা না থাকায় তার তেমন লাভ হত না। এসকেএস ফাউন্ডেশনের মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন প্রকল্পের সাথে ২০১৬ সাল থেকে সম্পৃক্ত হয়ে ব্যবসা পরিচালনা পদ্ধতি, মার্কেট লিটারেসি, জলবায়ু সহনশীল স্থায়ীত্বশীল কৃষি ও বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পান। তাছাড়া বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাথে তার যোগাযোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে তার উৎপাদন দ্বিগুন হয়েছে। আয়ের টাকায় তিনি বাড়ির পাশে জমি ক্রয় করেছেন। প্রকল্প থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেই জমিতে ২৪ শতকের একটি পুকুরে মাছ চাষ করছেন, দুটি গাভী ও দেশি মুরগী লালন-পালন করছেন। সেই সাথে ত্রিশ শতক জমিতে সারা বছর বিভিন্ন ধরণে শাকসবজি ও মৌসুমী ফলের চাষ করে সমন্বিত কৃষি ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। বর্তমানে তার মাসিক আয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। রাজেনা বেগম বলেন, আগে পণ্যের ভালো দাম পেতাম না, এখন দাম পাচ্ছি। আগে ভালো বীজ চিনতাম না, এখন নিজেই বীজ রাখছি ও নিজেই বীজ উৎপাদন করছি। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ কৃষি অধিদপ্তর থেকে তার বাড়িকে আদর্শ বাড়ি আখ্যা দেওয়া হয়। কঞ্চিবাড়ির নারী কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে রাজেনা বেগম এখন অনুপ্রেরণার নাম।
তৃণমূলের নারী কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে রাজধানীর গুলশানের বিক্রয়কেন্দ্র আউড়িতে। একশনএইড বাংলাদেশের উদ্যোগে গত বছরের ১১ এপ্রিল এটি যাত্রা শুরু করে এটি। সংস্থাটির প্রোমোটিং অপরচুনিটিজ ফর উইমেন্স এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড রাইটস (পাওয়ার) প্রকল্পের আওতায় গাইবান্ধা, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলার ৬ হাজারের বেশি নারী কৃষক তাদের জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি আউড়িতে পাঠাচ্ছেন। নারী কৃষক দল ও ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে পণ্য বিক্রির জন্য দালালকে কোনো টাকা না দিয়েই পণ্যের ন্যায্যমূল্য কৃষকেরা পাচ্ছেন।
আউড়িতে পণ্য পাঠানো শুরু করেছেন গাইবান্ধার লাকি বেগম। পাওয়ার প্রজেক্টের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করতে লাকি বেগমের নেতৃত্বে যুক্ত রয়েছেন আড়াই হাজার নারী।
লাকি বললেন, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব চন্দ্রিয়া গ্রামের পাঁচটি ইউনিয়নে কাজ করছেন তারা। তিনি বললেন, নারীদের বাজারে প্রবেশাধিকার নেই। সমাজ ভালো চোখে দেখে না। দালাল ধরে পণ্য বাজারে পাঠালে লাভ বলতে কিছু থাকে না। দেখা যায়, ৩০ টাকার লাউ বিক্রি করে দিতে হয় ১০–১৫ টাকায়। ন্যায্যমূল্যও পাওয়া যায় না। তাই আউড়িতে পণ্য পাঠানো হচ্ছে। সব খরচ শেষে লাভও থাকছে।
পটুয়াখালীর রাশিদা বেগম বলেন, স্থানীয় বাজারে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। পূর্বে সরাসরি মূল বাজারে গিয়ে বিক্রি করার সুযোগ না থাকায় মধ্যস্বত্তভোগীদের কারণে নারী কৃষক ও উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বর্তমানে সেই অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। একশনএইড বাংলাদেশ-এর মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন (এমএমডাব্লিউডাব্লিউ) প্রকল্পের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি সবজি চাষ শুরু করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন ও একশনএইড বাংলাদেশ-এর সহায়তায় তিনটি কালেকশন পয়েন্টের মাধ্যমে উৎপাদিত সবজি বিক্রয় করে অর্থ উপার্জনে সক্ষম।
একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, বাংলাদেশের নারীরা অনেক সচেতন এবং অবস্থার উন্নয়নেও তারা অনেক বেশি সচেষ্ট। কিন্তু তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বাজার ব্যবস্থাপনা। আমাদের গ্রামীণ কৃষি উদ্যোক্তারা, বিশেষ করে নারীরা যেন উপযুক্ত পরিবেশ পায় এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সরাসরি অংশ নিতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় পক্ষকে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
- বিষয় :
- গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা
