ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস কাল

কুসংস্কারে মানসিক রোগী বাড়ছে চট্টগ্রামে

কুসংস্কারে মানসিক রোগী বাড়ছে চট্টগ্রামে
×

প্রতীকী ছবি

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২২ | ০০:৪৩

রিমা চৌধুরী, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাসিন্দা। রাতে ঘুমানোর সময় হঠাৎ চিৎকার শুরু করেন। সকালে কথাবার্তায় অসংলগ্নতা। ভয় পেয়েছে, জিনের বাতাস লেগেছে- এমন ধারণা থেকে পরিবার রিমাকে স্থানীয় কবিরাজের কাছে নেন। রিমাকে দেখেই কবিরাজ 'জিনে ধরেছে' জানিয়ে শুরু করেন ঝাড়ফুঁক; দেন তাবিজ, পানি পড়া। দুই সপ্তাহ চলার পরও উন্নতি নেই। রিমার শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে স্থানীয় এক চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মানসিক ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রিমার মানসিক সমস্যা ধরা পড়ে, সঙ্গে অন্যান্য জটিলতা। শুরুতেই হাসপাতালে এলে যেগুলো সহজেই এড়ানো যেত বলে জানান চিকিৎসকরা।

চট্টগ্রামে অনেকেই মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের কুসংস্কারের কারণে সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এতে জটিলতা বেড়ে একেবারে পাগল হয়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলায় চিকিৎসকের চেয়ে মানুষের বেশি আস্থা কবিরাজ, তান্ত্রিক, ওঝা ও জ্যোতিষের অপচিকিৎসায়। সেখানে সর্বনাশ হওয়ার পর যান চিকিৎসকের কাছে। তখন চিকিৎসকের পক্ষে খুব আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু করার থাকে না। এ অবস্থার পরিবর্তনে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপকভাবে সচেতনতামূলক প্রচারণার তাগিদ দেন তাঁরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চমেক হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসাদের বেশিরভাগই অপচিকিৎসার শিকার। এখানে প্রতিনিয়ত রোগী বাড়লেও নেই চিকিৎসার সহজলভ্যতা। চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে মানসিক রোগের চিকিৎসায় নেই তেমন চিকিৎসক। গড়ে ওঠেনি বিশেষায়িত কোনো মানসিক হাসপাতাল। পুরো অঞ্চলের ভরসা চমেক হাসপাতালের মাত্র ৬০ শয্যা। অথচ চমেক হাসপাতালের মানসিক বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৬০ এবং চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে ২০ জন চিকিৎসা নিতে আসছেন।

এ বিষয়ে চমেক হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. তারেক আবেদীন সমকালকে বলেন, ডিজিটাল যুগেও মানসিক রোগ নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। এ জন্য গ্রামাঞ্চলে কারও মধ্যে সামান্য অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই জিনে ধরেছে, বাতাস লেগেছে ভেবে নেন। চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে তাঁরা কবিরাজ, ওঝা, তান্ত্রিক, বৈদ্যের কাছে ছুটে যান। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই।

তিনি বলেন, আমরা অপচিকিৎসার বলি এমন অহরহ রোগী পাচ্ছি। মানুষের বিশ্বাসের মাত্রা এতই বেশি যে, হাসপাতালে ভর্তির পরও শয্যায় বসে রোগীকে কবিরাজের পানি চালিয়ে যান। রোগীকে অভিভাবকদের ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে বিশেষ করে তরুণ রোগীদের।

চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বোর্ড অব ট্রাস্টির সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, মানসিক রোগ নিয়ে এখনও বেশিরভাগ মানুষ সচেতন নন। এ জন্য আক্রান্তদের বড় অংশই চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাববার সময় চলে এসেছে। নিয়মিত গবেষণার মাধ্যমে মানসিক রোগের অঞ্চলভিত্তিক কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকারে যত্নশীল হওয়া দরকার।

একই হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. এ এস এম রিদওয়ান বলেন, চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে আমরা নানা কর্মসূচি পালন করি। অপচিকিৎসা থেকে রক্ষা করতে কাউন্সেলিং করি। কুসংস্কারের ভূত সরাতে পারলে চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশেই মানসিক রোগী কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীরা বেশি আবেগপ্রবণ হয়। এই সময়ে তাঁদের মধ্যে বিষণ্ণতা কাজ করে। বিষণ্ণতা থেকেই তাঁরা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন, এমনকি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

চট্টগ্রামে নানা আয়োজন: বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে সোমবার চট্টগ্রামে দিনভর নানা আয়োজন রয়েছে। মানুষকে সচেতন করতে বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক আমির হোসেনের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন পাবনা মানসিক হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মাহফুজুল হক। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মনোরোগবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. এ এস এম রিদওয়ান। দিবসটি উপলক্ষে চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা আয়োজন করেছে।

আরও পড়ুন

×