ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

চাই মানবিক আচরণ

চাই মানবিক আচরণ
×

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২০ | ১৩:০৯

'কেউ কি ইচ্ছে করে অসুস্থ হয়? এটা কি কোনো আনন্দের ব্যাপার? নিজের অজান্তে যখন কেউ আক্রান্ত হয়ে যায়, তখন তার জীবনই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। তার পরিবারের সদস্য, আশপাশের মানুষেরাও থাকেন ঝুঁকিতে। অথচ কিছু মানুষ এমন করছে, আক্রান্ত হওয়াটাই যেন মারাত্মক অপরাধ। চিকিৎসাধীন স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে যখন চরম দুশ্চিন্তায় আছি, তখন প্রতিবেশী আর পরিচিতদের কেউ কেউ বলছেন, আমাদের নাকি গুলি করে মারা উচিত! আমরা নাকি দেশের শত্রু! চারপাশের মানুষের এমন আচরণে মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি।' এভাবেই নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন গাইবান্ধায় করোনা আক্রান্ত তিনজনের পরিবারের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য। সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের দুর্দশার কথাও একটু ভাবুন। একটু মানবিক আচরণ করুন। আমরাও কিন্তু কম সাফার করছি না।'
পেশায় সাংবাদিক ওই ব্যক্তি অনেক বছর ধরেই সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে থাকেন। চলতি মাসের শুরুতে দেশে ফেরার এক সপ্তাহ পর তার স্ত্রী-সন্তানের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। পরে তার পরিবারের আরেক সদস্যও করোনায় আক্রান্ত হন।
প্রবাসী ওই সাংবাদিক জানান, তার স্ত্রী-সন্তান যখন দেশে আসেন, তখনও যুক্তরাষ্ট্রে করোনা নিয়ে তেমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল না। এমনকি তারা দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর বা অন্য কোথাও কোয়ারেন্টাইনে থাকার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। কোনো সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়নি। তাছাড়া তখন তারা ছিলেন পুরোপুরি সুস্থ। এ কারণে অন্যান্যবারের মতো তারা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করেন। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানেও যোগ দেন। সেখান থেকে ফেরার একদিন পর ১৫ মার্চ তাদের জ্বর ও কাশি হয়। স্থানীয় হাসপাতালে গেলে তাদের বিদেশ থেকে আসার কথা শুনে আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিতে বলেন ডাক্তার। পরে ঢাকা থেকে আইইডিসিআরের একটি দল গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে। দু'দিন পর তারা করোনা আক্রান্ত হওয়ার তথ্যটি জানায়।
তিনি বলেন, 'এই খবর শুনে তো সবাই মুষড়ে পড়ি। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে আক্রান্ত স্ত্রী-সন্তান বাঁচবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। এমনই এক অসুখ যে, কাউকে বলাও যাচ্ছে না। কারও সাহায্য নেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু তারপরও লোকমুখে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। এতে এমন পরিস্থিতি হয় যে, লোকজন পারলে আমাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। কেউ জীবন্ত কবর দিতে চায়, কেউ বলে গুলি কর শালাদের। বিদেশ থেকে ভাইরাস নিয়ে আসছে। আমাদের দূরতম আত্মীয়, যারা রোগীর সংস্পর্শে আসেননি, তাদেরও নানা অপমান সহ্য করতে হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতি হতে পারে জানলে নিজেরাই সতর্ক থাকতাম। বিদেশে থাকলেও আমরা কিন্তু বাংলাদেশেরই নাগরিক। আমরাও দেশকে ভালোবাসি। আমাদের মাধ্যমে দেশের মানুষের ক্ষতি হোক তা কখনই চাইতাম না। অথচ কিছুদিন ধরে নানা মাধ্যমে পরিচিতজনরা সরাসরি বা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে আমাদের মরে যাওয়াই ভালো।'
জনমনে করোনা আতঙ্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমি একজন সাংবাদিক। আমি জানি, করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আতঙ্ক আছে। বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে এই ভাইরাস দেশে এসেছে বলে লোকজনের ক্ষোভও আছে তাদের প্রতি। সেটা অস্বাভাবিক নয়। তবে আমি শুধু এটুকু বলব, আমরা দায়িত্বজ্ঞানহীন না। যা হয়েছে, নিতান্তই অজান্তে হয়েছে। সেই অসাবধানতার জন্য কম খেসারত দিতে হচ্ছে না আমাদের।'
আক্রান্তদের স্বজনরা জানান, তিনজনকে এখন আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের সুস্থ তিন সদস্যকেও আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। তাদের সংস্পর্শে আসা সবারই করোনা পরীক্ষা করা হলেও সৌভাগ্যবশত অন্যরা সংক্রমিত হননি। তবু তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ২২ মার্চ সাদুল্যাপুরকে লকডাউনের ঘোষণা দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নবী নেওয়াজ। তার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাদুল্যাপুর উপজেলার ৯নং বনগ্রাম ইউনিয়নের হবিবুল্লাপুর গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেন করোনায় আক্রান্ত দুই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। ওই অনুষ্ঠানে উপজেলার পাঁচ শতাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় পুরো উপজেলা লকডাউন ঘোষণা করা হলো। অবশ্য পরে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন লকডাউনের ঘোষণা বাতিল করে ওই ইউএনওকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।
জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত ব্যক্তি বা তার স্বজনদের সামাজিকভাবে হেনস্তা না করার আহ্বান জানাচ্ছেন। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনেও তিনি এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে বলেছেন।










আরও পড়ুন

×