২৫ লাখ পশু অবিক্রীত, বড় খামারিরা বেশি লোকসানে
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৩ | ০৫:৩২
চলতি বছর কোরবানিযোগ্য ২৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫২১টি পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে। এতে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন খামারি ও ব্যাপারীরা। খামারিদের মধ্যে যাঁরা বড় গরু বাজারে এনেছিলেন, তার প্রায় ৫০ শতাংশই অবিক্রীত রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। চড়া দামের খাবার খাইয়ে, ব্যাংক ঋণ নিয়ে যাঁরা খামার করেছেন, তাঁদের অনেকের অবস্থা করুণ। খামার পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোই এখন তাঁদের জন্য কঠিন হবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া ও ভারত-মিয়ানমার থেকে অবৈধ পথে গরু আসায় এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি। এর মধ্যে ১ কোটি ৪১ হাজার ৮১২টি পশু কোরবানি হয়েছে, অর্থাৎ ২৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫২১টি পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে বা কোরবানি হয়নি। গত বছর সারাদেশে ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৩টি পশু কোরবানি হয়েছিল। সেই হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার ৯১ হাজার ৪৯টি বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। তবে, এ বছর সরকার যে পরিমাণ কোরবানির পশুর চাহিদার কথা আগে জানিয়েছিল, তার চেয়ে কম পশু কোরবানি হয়েছে।
এ বছর চাহিদার চেয়ে বেশি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে জানিয়ে গত ১৪ জুন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছিলেন, এবার ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে। সেই হিসাবে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯২৭টি পশু কম কোরবানি হয়েছে।
মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোরবানি হওয়া পশুর মধ্যে ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৬০টি গরু, ১ লাখ ৭ হাজার ৮৭৫টি মহিষ, ৪৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৮টি ছাগল, ৫ লাখ ২ হাজার ৩০৭টি ভেড়া এবং ১ হাজার ২৪২টি অন্যান্য পশু। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর সারাদেশে ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৩টি পশু কোরবানি হয়েছিল।
রাজধানীর কোরবানির বাজারে বিক্রি না করতে পেরে সাতটি গরু ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন বগুড়া সদরের আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, ‘আমি ২৫টি গরু বিক্রি করার জন্য এনেছিলাম। তার মধ্যে ১৭টি বিক্রি করতে পেরেছি। আমার সব গরু বড় ছিল, সবই ঘাটতিতে বিক্রি করেছি।’ খামারে যে গরু ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা দর উঠেছিল, ঢাকায় এনে সেটা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন তিনি। অথচ সেই গরুর পেছনে খরচ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
মানিকগঞ্জ, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, যশোরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের খামারি ও মৌসুমি পশু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা ছিল বেশি। সেই তুলনায় বড় গরুর ক্রেতা ছিলেন খুবই কম। যাঁরা বড় গরু বিক্রির জন্য ঢাকার বাজারগুলোতে এনেছিলেন, তাঁদের ৫০ থেকে ৯০ শতাংশই অবিক্রীত থেকে গেছে। তবে ঢাকায় বিক্রির জন্য আনা খামারিদের গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ গরু অবিক্রীত রয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের খামারি মজিবুল হক রাজধানীর গাবতলী হাটে ১১টি গরু আনেন। তাঁর তিনটি গরু বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগের চেয়েও কম দামে গরুগুলো বিক্রি করতে হয়েছে। শুধু যাতায়াত খরচ ও শ্রমিকদের থাকা-খাওয়ার খরচ জোগানোর জন্য সেগুলো বিক্রি করেছি। এই খামারির ২২ লাখ টাকা ঋণ আছে। হাটে গরু বিক্রি করে তা পরিশোধের চিন্তা ছিল।
খামারিরা বলছেন, যাঁরা গরু বিক্রি করতে পারেননি, উল্টো ঢাকায় এসে বাড়তি কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে তাঁদের। এখন গরু পালন করতেই হিমশিম খেতে হবে। কারণ আগের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করলে নতুন ঋণও পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে গোখাদ্যের দাম চড়া।
এবার ৪৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩৫টি গরু-মহিষ কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে ছাগল-ভেড়া কোরবানি হয়েছে ৫৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫টি। অর্থাৎ গরু-মহিষের চেয়ে ছাগল-ভেড়া সাড়ে ৬ লাখের বেশি কোরবানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতার কথাই বলছেন। বড় প্রাণী বা গরু-মহিষ কোরবানি দেওয়ার সক্ষমতা কমায় মানুষ ছোট প্রাণীর দিকে ঝুঁকেছেন।
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি মো. ইমরান হোসেন বলেন, মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এ কারণে কম কোরবানি হয়েছে। সাধারণ মানুষ কোরবানি না দিলেও এবার নির্বাচনী বছরের কারণে রাজনৈতিক নেতারা বেশি কোরবানি দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোরবানি ঈদ সামনে রেখে দেশের সব খামারি ও কৃষক সারা বছর ধরে পশু লালন-পালন করেন। একটু লাভের আশায় তাঁদের এ পরিশ্রম। কিন্তু আশায় গুড়েবালি পড়ছে ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসার কারণে।
সাদিক এগ্রোর কর্ণধার ইমরান হোসেন বলেন, প্রান্তিক কৃষকরা মূলত ছোট গরু উৎপাদন করেন। আমাদের দেশে যে পরিমাণ গরুর চাহিদা, তার ৪৫ শতাংশ প্রয়োজন হয় কোরবানির ঈদে। বাকি গরু সারা বছর বিক্রি হয়। সারা বছর মাংসের দোকানে ছোট ছোট গরু জবাই করা হয়। এগুলো কখনোই বড় বড় খামার থেকে যায় না। বড় খামারিদের খরচ অনেক বেশি। ফলে ছোট গরু বড় প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে না। প্রান্তিক খামারি নিজের ঘরেই গরু লালন-পালন করেন। তাঁর তেমন কোনো খরচ নেই। অথচ আমরা বড় গরু বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছি। বাংলাদেশে যে পরিমাণ পশু কোরবানি হয়, তার মধ্যে ৯৮ শতাংশ ছোট গরু। ছোট গরুর মূল উৎপাদক প্রান্তিক খামারি। ফলে প্রান্তিক চাষিদের নিয়ন্ত্রণেই আছে এ খাত। দেশি গরুর চাহিদা অনেক বেশি, যা করপোরেট প্রতিষ্ঠান পূরণ করতে পারে না। তাই এবার ঈদে আমাদের মতো করপোরেট প্রতিষ্ঠান বড় লোকসানে পড়েছে।
তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলেন, শুধু কোরবানির সময় পশু থাকবে। তার পর সারা বছর সংকট থাকবে– এটা যেন না হয়। আমাদের স্টক (মজুত বা অবিক্রীত পশু) থাকবে, সারা বছর অনেক উৎসব আছে। প্রতিদিন গরুর প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ঠিকই আছে।
- বিষয় :
- পশু কোরবানি
- কোরবানির পশু
- লোকসান
