ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশেষজ্ঞ মত

আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা জাগাতে হবে

আইনের শাসনের  প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা  জাগাতে হবে
×

ড. তৌহিদুল হক

ড. তৌহিদুল হক

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৫ | ০১:৩৫ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৫ | ১০:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার মধ্য দিয়ে প্রচলিত নিয়মকানুনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্প্রীতি তৈরি হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এসব ছাড়িয়ে দু-একটি ঘটনা সমাজকে নাড়িয়ে দেয়। আবার বড় কোনো পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া আকাঙ্ক্ষা কিংবা চেতনা যদি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করতে না পারে, তখন সমাজে নানা ধরনের সংঘাত-সহিংসতার সূত্রপাত হয়। এ অবস্থার পূর্ব ধাপ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যখন যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করতে সময়ক্ষেপণ করে অথবা বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রশ্নে যখন বিলম্ব হয়, তখন অপরাধীরা নানাভাবে সক্রিয় হয়।
সংঘাত, সহিংসতা, হত্যা, হামলা-মামলা, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা আমাদের রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে আমরা দেখি, শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন হয়, কিন্তু অপরাধমূলক প্রক্রিয়াগুলো একই রকম থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রকে ধারণ করে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার যে অভিপ্রায়, তা তাদের নেতাকর্মীর সবাইকে যে স্পর্শ করে, সেটি বলারও সুযোগ নেই। আবার দলের রাজনৈতিক যে আদর্শ কিংবা কর্মসূচি– তাও সব মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে না। অনেকে বলার চেষ্টা করেন, আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো মোটাদাগে জনগণকে বেশ কয়েকটি ভাগে (রাজনৈতিকতার আদর্শ অথবা মার্কার ভিত্তিতে) বিভাজন করে ফেলেছে। এই বিভাজন আমাদের অনেক সংঘাত-সহিংসতার পেছনে অন্যতম কারণ।

আমরা তো চেয়েছি যে একটি সরকার, যারা জগদ্দল পাথরের মতো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তাদের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র ব্যবস্থার এক ধরনের সংস্কার দ্রুত সময়ের মধ্যে হবে। যেখানে সবার অধিকার এবং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বোধের জয়গান সমাজের মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকবে। কিন্তু আমরা তো চারপাশে তাকালে সে বিষয়টি লক্ষ্য করছি না; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দখলের মানসিকতা, আধিপত্য বিস্তার কিংবা নিজ দলের মধ্যে অন্তর্কোন্দল, দখল বাণিজ্য, অস্ত্র-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি কিংবা মাদক-বাণিজ্য– এই অপরাধগুলোর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। বরং এই অপরাধগুলোর সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে, তাদের একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় আমরা খুঁজে পাচ্ছি।

আমরা এখন লক্ষ্য করছি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রশ্নে একটি মব ভায়োলেন্সের প্রসঙ্গ আছে। কোনো ব্যক্তিকে যদি ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতে চায়, তাহলে তাঁকে কোনো একটি ট্যাগ দিয়ে আক্রমণ করে। যারা এটা করছেন, তাদের যে খুব একটা বেশি আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে অথবা আইনি জবাবদিহির মুখে পড়তে হচ্ছে, সেই বাস্তবতা বা উদাহরণও কিন্তু আমরা তৈরি করতে পারছি না। মানুষের মধ্যে এখনও কিন্তু একটা ভয় আছে। আমরা আইনের শাসনের দিকে হাঁটতে চাই। আইনের পথে হাঁটতে চাই।

থানা থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে কিংবা পুলিশ অপরাধীদের দ্বারা শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, মনস্তাত্ত্বিক হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এ রকম একটি বাস্তবতা কোনো একটি সমাজে চলতে থাকলে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিরা অপরাধমূলক তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়।
আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার মধ্যে দিয়ে একটি নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের দিকে প্রবাহিত করতে পারলেই জনগণ একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আসে। এবং সেই শৃঙ্খলার নেতৃত্বের জায়গায় রাজনৈতিক দলগুলোকে অভিভাবকের পরিচয় দিতে হয়।

ড. তৌহিদুল হক : সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন

×