ফেসবুকে বন্ধ হচ্ছে না জুয়ার বিজ্ঞাপন এআই ভিডিও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
.
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৯:৫৯
আইনি নিষেধাজ্ঞা, আদালতের নির্দেশনা ও ফেসবুকের (মেটা) নিজস্ব নীতিমালার পরও অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রতিদিন হাজার হাজার তরুণ-যুবকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নজরদারি জোরদার না হলে এবং মেটা কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার আসক্তি ও প্রতারণা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। গতকাল রোববার ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ডিসমিসল্যাবের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার জুয়ার বিজ্ঞাপন বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের সামনে এসেছে। এক বছর পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। বরং নতুন কৌশলে প্রতিদিন শত শত জুয়ার বিজ্ঞাপন ছড়াচ্ছে ফেসবুকসহ মেটার প্ল্যাটফর্মে। এখন এই অবৈধ প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো ভিডিও। এসব ভিডিওতে কখনও রাজনৈতিক সমাবেশে নেতার বক্তব্য, কখনও আদালতের কক্ষ, কখনও হাসপাতাল বা বাজারের দৃশ্য ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে। এসব ভিডিও হাজির হচ্ছে এআই দিয়ে তৈরি মা-মেয়ে, আইনজীবী, রিকশাচালক বা চিকিৎসক চরিত্র।
এক দিনেই চার হাজারের বেশি বিজ্ঞাপন
গত ১২ আগস্ট মাত্র ১০টি কিওয়ার্ড দিয়ে মেটার অ্যাড লাইব্রেরিতে অনুসন্ধান চালিয়ে ডিসমিসল্যাব খুঁজে পেয়েছে ৪ হাজার ১৬১টি বিজ্ঞাপন। ক্রিকিয়া, মোস্টবেট, জিতা, জিতাছে, বাবু৮৮, ক্যাসিনো, বেটিং, লাকি৭, বাজি ও এফবি৭৭– এই শব্দগুলোতে চালানো বিজ্ঞাপনগুলো ২২৫টি পেজ থেকে ছড়ানো হচ্ছিল।
সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন চালিয়েছে ‘লাক বিডি’ ও ‘এফবি৭৭ সুপার লাকি’ নামের দুটি পেজ। প্রথমটি ১ হাজার ৩৭৯টি এবং দ্বিতীয়টি ১ হাজার ২৬৫টি বিজ্ঞাপন চালায় এক দিনে। আরও কয়েকটি পেজ থেকে চালানো হয়েছে শতাধিক বিজ্ঞাপন। পেজগুলোর প্রশাসনিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ৬২টি পেজ বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশি প্রশাসকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিয়েতনামে ৬০ জন, এরপর ভারতে ২০, মালয়েশিয়ায় ১৮ ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ জন।
প্রচলিত ভিডিওর বদলে এআই দৃশ্য
২০২৪ সালে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছিল, সেলিব্রেটিদের ভুয়া ভিডিও এডিট করে কিংবা টেলিভিশনের লোগো জালিয়াতি করে এসব বিজ্ঞাপন বানানো হতো। এবার সেই জায়গা দখল করেছে এআই ভিডিও।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক রিকশাচালক অভিযোগ করছেন, সারা দিন খেটে আধা কেজি মাংস কেনাও তাঁর পক্ষে কঠিন। পাশে দাঁড়ানো স্যুট পরা লোকটি বলে ওঠে, ‘আমিও আগে দিনমজুর ছিলাম। হঠাৎ এফবি৭৭ আমার জীবন বদলে দিয়েছে।’ তারপর শুরু হয় অ্যাপের অফার ও বোনাসের প্রচারণা।
অন্য এক ভিডিওতে হাসপাতালের দৃশ্য। অসহায় এক মা সন্তানের অস্ত্রোপচারের টাকা জোগাড় করতে না পেরে কাঁদছেন। হঠাৎ এক ব্যক্তি সমাধান দেখিয়ে বলেন, ‘একটাই উপায় আছে– এফবি৭৭।’ পরক্ষণেই মোবাইলের স্ক্রিনে লাকি ড্র দেখানো হয় এবং ওই ব্যক্তি হাসপাতালের কাউন্টারে টাকা জমা দিয়ে বলে ওঠেন, ‘এই টাকা জেতা থেকে এসেছে।’
ভিডিওতে আদালতের এক দৃশ্যে দেখা যায়, আইনজীবীরা তর্ক করছেন। একপক্ষ অভিযোগ করছে, এফবি৭৭ নেশা ধরাচ্ছে ও অর্থ নষ্ট করছে। অপরপক্ষ যুক্তি দিচ্ছে, এটা আসলে আয়ের উৎস। শেষমেশ বিচারকও অ্যাপটির লিংক জানতে চান।
সবচেয়ে আলোচিত একটি ভিডিও বানানো হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সমাবেশের আদলে। সেখানে দলীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহকে নকল চরিত্রে দেখানো হয়, যিনি জনগণকে জুয়ার অ্যাপে যোগ দিতে উস্কে দিচ্ছেন ‘আয়ের পথ’ হিসেবে। এই ধরনের মোট ৪৬টি এআই ভিডিও অনুসন্ধানকারীরা শনাক্ত করেছেন।
আইনের লঙ্ঘন ও মেটার নীরবতা
বাংলাদেশের আইনে অনলাইন জুয়া ও বিজ্ঞাপন স্পষ্টতই নিষিদ্ধ। ১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং আইনে জুয়া অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ২০২২ সালে হাইকোর্টও এক আদেশে ডিজিটাল মাধ্যমে জুয়া প্রচার কেন বন্ধ করা হবে না, সে প্রশ্ন তোলেন। চলতি বছরের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে অনলাইনে জুয়া পরিচালনা, সহযোগিতা বা বিজ্ঞাপন দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেটার নীতিমালা অনুযায়ীও জুয়ার বিজ্ঞাপন বাংলাদেশে প্রচার করার অনুমতি নেই। ১৮ বছরের নিচে কারও কাছে এই বিজ্ঞাপন পৌঁছানো নিষিদ্ধ।
- বিষয় :
- জুয়া
