ভারত থেকে পুশইন
মহানন্দায় মিশছে দানেশ শেখের চোখের জল
চার মাসে ঠেলে দেওয়া হয় ২,৩৪২ জনকে, রোহিঙ্গা ১৯৩
সোনালীর স্বামী দানেশ শেখ (বাঁয়ে) এবং প্রতিবেশী সুইটি ও তাঁর দুই সন্তান। গতকাল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের নয়াগোলা গ্রামে ফারুক হোসেনের বাড়ি থেকে তোলা- সমকাল
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৪ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দানেশ শেখ কাঁদছেন। তবে সবাই তা দেখে না। দেখে কেবল মহানন্দা। দানেশ প্রতিদিন মহানন্দা নদীতে যান গোসল করার কথা বলে। সেখানে নদীর জল আর চোখের জল কখন এক হয়, জানেন কেবল দানেশ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ-সংলগ্ন এই নদীর ওপারে ভারত। সে দেশের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে তাঁর বাস। তিনি ভারতের ‘ঠেলে পাঠানো’ নীতির নির্মম শিকার। তাঁর পরিবার নিয়ে এখন বাংলাদেশ, ভারত দুদেশে মামলা চলছে। বীরভূমের দুটি পরিবারের ছয় সদস্যকে গত ২৫ জুন কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠায় (পুশইন) ভারতের বিএসএফ। দানেশের পরিবারে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সোনালী খাতুন, ৮ বছরের ছেলে সাব্বির।
একই গ্রামে সুইটি বিবি (৩৩), তাঁর ছেলে কুরবান শেখ (১৬) ও ইমাম (৬) হয়েছেন পুশইনের শিকার। দুই পরিবারই কাজের সূত্রে দিল্লি থাকতেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানুষদের সেখান থেকে ধরে এনে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। কারণ তারা বাংলাভাষী।
বাংলাদেশে এসে তারা ১০১ দিন কারাগারে ছিলেন। দুই পরিবারের ছয়জন জামিন পান ৩০ নভেম্বর। এর বড় কারণ সোনালী ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। তাদের ঠেলে পাঠানোর ঘটনায় মামলা হয় ভারতের আদালতেও। সে দেশের আদালত তাদের ফেরত নিতে ভারত সরকারকে আদেশ দেন। আর বাংলাদেশের আদালতের নির্দেশ ছিল তাদের কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে নিজ দেশে ফরত পাঠানোর। মধ্যবর্তী সময়ে তাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের নয়গোলা গ্রামের ফারুক হোসেনের জিম্মায় দেন আদালত।
তারপর কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার ছয়জনকে নিয়ে যাওয়া হয় সোনামসজিদ জিরো পয়েন্টে; ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের জন্য। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ শুধু সোনালী ও তাঁর ছেলে সাব্বির শেখকে গ্রহণ করে। ভেঙে যায় পরিবার। দানেশ শেখ রয়ে যান এপারে। সঙ্গে প্রতিবেশী সুইটি ও তাঁর দুই সন্তান। এখনও তারা আছেন ফারুক হোসেনের বাড়িতে।
সেদিন স্ত্রী-সন্তানকে চোখের জলে বিদায় দিতে হয়েছে দানেশকে। সীমান্তের কাঁটাতার সত্যিকারের কাঁটা হয়ে বিঁধল তাঁর জীবনে। .ফারুক ও তাঁর স্ত্রী মমতাজ বেগম প্রতিবেশী দেশের এই মানুষদের ভোরণপোষণ করছেন। একই হাঁড়িতে চলছে দুই দেশের মানুষের রান্না। আত্মীয়তা নয়; মানবতা এসে সামনে দাঁড়িয়েছে ফারুকের।
ফারুক হোসেন সমকালকে জানান, তাঁর দাদা-দাদি, চাচা, ফুফুরা বীরভূমের বাসিন্দা। দেশ ভাগের পর তারা এপারে চলে আসনে। তবে ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে, প্রয়োজনে বীরভূমে যান ফারুকের পরিবারের সদস্যরা। বীরভূমে তাঁর দাদা-দাদির বাড়ির কাছাকাছি দানেশ শেখের বাড়ি। বেড়াতে গেলে তাদের সঙ্গে সেখানে দেখা হতো। তবে পুশইনের শিকার হওয়ার আগে সোনালীর পরিবারের সদস্যরা কখনও বাংলাদেশে আসেননি। আসলে পাসপোর্ট করার মতো টাকা-পয়সা তাদের নেই।
ফারুক হোসেন জানান, হঠাৎ একদিন বীরভূম থেকে একটি ফোন আসে। সেখানকার জনপ্রতিনিধি সামিরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী তাঁকে ফোন করেন। তিনিও ফারুকের পূর্বপরিচিত। সামিরুল তাঁকে জানান, বীরভূমের ছয়জন বাসিন্দা বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ কারাগারে আছেন। তিনি তাদের খোঁজ নেওয়ার অনুরোধ জানান। সেই সূত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করে ১০১ দিন কারাগারে থাকার পর আদালত সোনালীসহ ছয়জনকে ফারুকের জিম্মায় জামিন দেন। এক সপ্তাহ পরপর তাদের ব্যাপারে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন স্থানীয় পুলিশকে। ৩০ নভেম্বর থেকে এই ভারতীয়রা ফারুকের বাড়িতে আছেন।
বালু ও পাথর ব্যবসায়ী ফারুক বলেন, ছেলেসহ সোনালী ফিরতে পেরেছেন। কিন্তু তাঁর স্বামী দানেশ এপারে অস্থির। অনাগত সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তায় সময় পার হয় তাঁর। বাড়ির পাশের মহানন্দা নদীর পারে গিয়ে উদাস বসে থাকেন দানেশ। বাড়ির সামনে পুলিশসহ প্রশাসনের লোকজন থাকেন। কারণ এদের জিম্মাদার আমি। তিনি বলেন, ‘আত্মীয় না হলেও আমি তাদের ফেলে দিতে পারব না। যতদিন দেশে ফিরতে না পারবেন, ততদিন আমার কাছে থাকবেন।’
ফারুক জানান, কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে পুশইনের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এসে কিছু দিন দানেশরা পেটের দায়ে রেস্টুরেন্টে কাজ করেছেন। পুলিশ তাদের আটক করে কারাগারে পাঠায়। আদালতের নির্দেশে ২২ আগস্ট তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়। পরে মানবিক কারণে জামিন দিয়ে তাঁর জিম্মায় দেওয়া হয়।
দানেশ শেখ মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেন, ‘সোনালীর সঙ্গে ফোনে তাঁর কথা হয়। বলে, ভালো আছে। আমাকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে। আমাদের মামলাটি ১২ ডিসেম্বর ভারতের আদালতে উঠবে। আশা করি, দ্রুত স্ত্রী ও সন্তানের কাছে যেতে পারব।’
ফারুকের স্ত্রী মমতাজ বেগম সমকালকে বলেন, ‘স্বামী, সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে আমাদের চারজনের সংসার। ৩০ নভেম্বর থেকে তারা আমাদের সংসারে আছেন। দুজন ভারতে যেতে পেরেছেন। বাকি চারজন ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। দানেশ বেশি ভেঙে পড়েছেন। প্রতিদিন মহানন্দা নদীতে গোসল করতে যান। নদীর পাশে বসে কান্নাকাটি করেন। খাবার সময় ডেকে নিয়ে আসি। কখনও আবার নিজে চলে আসেন।’
ফারুকের বাড়িতে আশ্রিত সুইটি বেগম সমকালকে বলেন, বীরভূমে বাড়ি হলেও ছোটবেলা থেকে দিল্লিতে থাকেন তিনি। বছর চারেক আগে স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর তিন সন্তান নিয়ে সংগ্রাম করছেন। তাঁর এক ছেলে ইমরান নানির সঙ্গে বীরভূম থাকে।
সুইটি বলেন, ‘দিল্লি থেকে আটকের পর বারবার বলছিলাম, আমরা ভারতের নাগরিক। তারা বিশ্বাস করছিল না। সীমান্ত পার করে কুড়িগ্রামের জঙ্গলে ঠেলে দেওয়া হয়। বাচ্চাদের নিয়ে দুই দিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। না খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। পরে আমাদের উদ্ধার করে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকায় রাস্তায় রাস্তায় ছিলাম। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের নম্বরে ফোন করি। তাঁর পরামর্শে আমরা সেখানে যাই। একটি ঘর ভাড়া করে দেওয়া হয়। সেখানে একটি হোটেলে কাজ শুরু করি। পরে একদিন আমাদের পুলিশ আটক করে।’
সুইটি সমকালকে বলেন, ‘আমার এক ছেলে বীরভূমে আছে। সে আমাদের জন্য কান্নাকাটি করে। আমরাও তাকে নিয়ে চিন্তায় আছি। আত্মীয়স্বজন দুশ্চিন্তা করছে।’
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইন করা হয়েছে দুই হাজার ৩৪২ জনকে। তাদের মধ্যে ১৯৩ রোহিঙ্গাও রয়েছে। এ ছাড়া ভারত থেকে এপারে ঠেলে দেওয়া ১২০ ভারতীয় নাগরিককে সীমান্ত থেকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা ব্যাটালিয়নের (৫৯ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া সমকালকে বলেন, অল্প সময়ের নোটিশে পুশইনের শিকার দুটি পরিবারের ছয় সদস্যকে বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের জন্য জিরো পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা সোনালীকে একটি অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্সে সেখানে নেওয়া হয়েছিল। তবে সোনালীর স্বামী ও আরেকটি পরিবারের তিন সদস্যকে বিএসএফ গ্রহণ করেনি। স্বামীর জন্য সোনালী কান্নাকাটি করছিলেন। ছোট্ট সন্তানসহ ফেরত গেছেন তিনি। আশা করি, দ্রুত অন্যরা ফিরতে পারবেন।
ভারতের মানবাধিকারকর্মী কিরীটী রায় সমকালকে বলেন, ‘যে কোনো নাগরিকের জীবনের অধিকার রাষ্ট্র ও সরকারকে নিশ্চিত করতে হয়। ভারত সরকার এ বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হবে– এই প্রত্যাশা করি।’
- বিষয় :
- পুশইন
- বিজিবি
- মানবাধিকার
- বিএসএফ
- ভারত
