ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলা: দোষীদের দ্রুত খুঁজে বের করার আহ্বান

রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট ব্যক্তি দেশি-বিদেশি সংস্থার নিন্দা

প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলা: দোষীদের দ্রুত খুঁজে বের করার আহ্বান
×

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, আগুনের ক্ষত। গতকাল শুক্রবার দুপুরে তোলা -সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২২ | আপডেট: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও আগুনের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিশিষ্ট ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক এবং দেশি সংস্থা-সংগঠন।

গতকাল শুক্রবার তারা ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি, বার্তা ও বক্তব্য দিয়েছেন। দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জোটভুক্ত হয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ১০টি দেশ নিন্দা জানিয়েছে।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান শরিফ বিন হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার রাতে এ হামলা চালায় বিক্ষুব্ধরা। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরও লাঞ্ছিত হন। এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা পত্রিকা দুটির সম্পাদক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকারের উচিত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

দুপুর ১টা ৩৮ মিনিটে সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে সত্যের ওপর হামলা।’

বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশন (এমএফসি)। এই হামলাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের জানার অধিকারে সরাসরি আঘাত বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। ঢাকায় অবস্থিত পশ্চিমা দূতাবাসগুলোর মধ্যে কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজার‍ল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য এ যৌথ বিবৃতিতে সই করে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা সব গণমাধ্যমকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানাই। সাংবাদিকদের ভয়মুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ থাকতে হবে।’ 

এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। বিবৃতিতে বলা হয়, সংস্থাটি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতিতে বলেন, ‘দেশের সংকটময় মুহূর্তকে কাজে লাগানোর জন্য যারা অপেক্ষা করে, তারা দেশের শত্রু। এই দুঃখজনক মুহূর্তকে তারা ধ্বংসাত্মক কাজে রূপান্তর করল।’ এই হামলা নির্বাচন বানচালের অপকৌশল কিনা, তা খতিয়ে দেখতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এর ওপর হামলা মানে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত। তিনি এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন নিয়ে গঠিত ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ নিন্দা জানিয়েছে। জোটের শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম, হাসনাত কাইয়ূম ও মজিবুর রহমান মঞ্জু যৌথ বিবৃতিতে বলেন, পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসররা দেশে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। তারা আগামী নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া বানচাল করতে অরাজকতা সৃষ্টি করছে।

সন্ধ্যায় ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শনে যান জোটের নেতারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।\

গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে যে ‘ন্যক্কারজনক’ বর্বরতা চালানো হয়েছে, তার দায় সরকারকে নিতে হবে। 

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়, এসব ঘটনা দেশকে একটা চূড়ান্ত নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাবে। বিবৃতিতে সই করেন বজলুর রশীদ ফিরোজ, সাজ্জাদ জহির চন্দন, আব্দুল্লাহ ক্কাফী রতন, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, নাজমুল হক প্রধান, ইকবাল কবির জাহিদ, মোশরেফা মিশু, মাসুদ রানা ও আব্দুল আলী।
এ ছাড়া জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

প্রথম আলোর মানববন্ধন
গতকাল শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন পত্রিকাটির সংবাদকর্মীরা। ওই সময়ও এক দল লোক বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করলে তড়িঘড়ি মানববন্ধন শেষ হয়। পত্রিকাটির সম্পাদক মতিউর রহমান ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদির দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এটা বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ আছে যে, পরিকল্পিতভাবে একটি সংগঠিত মহল এ হামলা চালিয়েছে। আমাদের সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকিতে ছিলেন। তারা বাধ্য হয়ে কাজ অসামাপ্ত রেখে চলে যান। গত ২৭ বছরে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম আলো কখনও বন্ধ হয়নি। এটা বাংলাদেশের বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ। একই সঙ্গে ডেইলি স্টারে আক্রমণ হয়েছে। আমরা বলতে চাই, এটা কালো দিন– সাংবাদপত্রের জন্য, বাকস্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। আমাদের বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ আছে যে, আগামী নির্বাচনকে পথভ্রষ্ট ও দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে নেতিবাচক করার জন্য এটা করা হয়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত হোক। দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক। নাগরিক সমাজকে আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করার আহ্বান জানাই।’

বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া
এর আগে সকালে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবন পরিদর্শন করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তবে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি।

নাগরিক সমাজের ব্যানারে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রথম আলোর সামনে জমায়েত হয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানান। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সামিনা লুৎফা বলেন, ‘এ হামলার বিরুদ্ধে সব গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশে এখন জটিল সময়। জনগণকে শান্ত রাখতে সচেষ্ট হোন। আমরা আর উস্কানি দেখতে চাই না। কোনো সহিংসতা দেখতে চাই না। আমরা নাগরিকদের নিরাপত্তা চাই। সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা রকম খেলা চলছে। সবার কাছে আহ্বান জানাই, কেউ হাতে আইন তুলে নেবেন না।’ আইনজীবী সারা হোসেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান, আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন, নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন, গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ, তাসলিমা আখতার, চলচ্চিত্র নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন এই প্রতিবাদ সমাবেশে ছিলেন।

বিকেল ৩টায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর আমার সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে সাহায্যের জন্য আমি উন্মত্ত, কান্নাজড়িত ফোন পেয়েছি। আমার সব বন্ধুদের কাছে, আমি দুঃখিত যে আপনাদের সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমি সঠিক লোকদের কাছে ফোন করে সাহায্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সময়মতো পৌঁছায়নি। ততক্ষণে দুটি সংবাদপত্র দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ জনতার আক্রমণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে এবং তা সহ্য করেছে। আমি জানি না কোন ভাষায় আপনাদের সান্ত্বনা দেব। একজন প্রাক্তন সাংবাদিক হিসেবে আমি শুধু দুঃখিত। আমি যদি মাটি খুঁড়ে নিজেকে লজ্জায় কবর দিতে পারতাম!’

প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার গতকাল সকাল ৯টায় ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘আমি শোকাহত, দুঃখিত এবং লজ্জিত।’

সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব এস এম ফয়েজ বিকেল ৩টায় তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘গণমাধ্যম অফিসে ন‍্যক্কারজনক হামলার উস্কানিদাতারা এই দেশের শত্রু।’

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, হাদির হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা সামলানোর ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থতা দেখিয়েছে। জননিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি জানান তারা। বিবৃতিতে সই করেছেন আনু মুহাম্মদ, মাহতাব উদ্দীন আহমেদ, মারজিয়া প্রভা, ফেরদৌস আরা রুমী, আকরাম খান, রাফিকুজ্জামান ফরিদ, আফজাল হোসেন, ফারহানা শারমীন ইমু ও নওশাদ এহসানুল হক।

সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিবাদ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়ে বলেন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টারে হামলা, নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে লাঞ্ছনা, ছায়ানটে হামলা এবং দিপু চন্দ্র দাসকে হত্যা করা হয়েছে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এসবই মুক্তচিন্তা, ভিন্নমত ও স্বাধীন মতপ্রকাশকে পরিকল্পিতভাবে দমনের জ্বলন্ত উদাহরণ। স্বাধীন গণতন্ত্রপ্রত‍্যাশী বাংলাদেশে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক আক্রমণ শুধু অগ্রহণযোগ্য নয়, বরং তা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব পালনে বিব্রতকর ব্যর্থতার সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বিবৃতিতে বলেন, এ ধরনের সমন্বিত হামলা দেশে উগ্র ও সহিংস চিন্তার বিপজ্জনক বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়। এতে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার বিশেষত মতপ্রকাশ, সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকাশ পাচ্ছে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বিবৃতিতে এ ঘটনার নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

এ ছাড়া কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিক্যাব এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছে।

আরও পড়ুন

×