ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ সরকারি অর্থে

৩৫ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প

ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ সরকারি অর্থে
×

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২০ | আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) শোধন ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এ জন্য ইআরএলের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ নামে একটি প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলতি মাসেই শুরু হচ্ছে।  

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো, পরিবেশ সহায়ক জ্বালানি তেল উৎপাদন এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি-নির্ভরতা কমাতে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইআরএলের পরিশোধন ক্ষমতা বর্তমানের চেয়ে আরও ৩০ লাখ টন বাড়বে। 

১৯৬৮ সালে চালু হওয়া ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। ২০১২ সালে ৩০ লাখ টন সক্ষমতার আরেকটি রিফাইনারি ইউনিট নির্মাণের জন্য ‘ইআরএল-২’ প্রকল্প হাতে নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। তবে অর্থায়ন নিয়ে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং এস আলম গ্রুপের যৌথ অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায় ইআরএল-২ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন সরকার।

গত বছর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ২৯ আগস্ট এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায় ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের প্রস্তাব বাতিল করে সরকার।
গতকাল ইআরএলের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পসহ ৪৬ হাজার ৪২০ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ২২টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। সাধারণত একনেক বৈঠক শেষে প্রকল্পের বিস্তারিত এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তবে গতকালের বৈঠক শেষে কোনো ব্রিফিং হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, পরিকল্পনা উপদেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অন্য কর্মসূচি থাকায় ব্রিফিং বাদ দেওয়া হয়েছে। 

একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নতুন প্রকল্প ১৪টি, সংশোধিত প্রকল্প পাঁচটি ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প রয়েছে তিনটি। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৪৬ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এই ব্যয়ে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩০ হাজার ৪৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। বিদেশি ঋণ এক হাজার ৬৮৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন ১৪ হাজার ২৪৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। 

জ্বালানি হবে পরিবেশ সহায়ক
প্রকল্প প্রস্তাব থেকে জানা যায়, নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। এতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। 
নতুন প্রকল্পে উৎপাদিত জ্বালানি হবে পরিবেশ সহায়ক ইউরো-৫ মানের। একই সঙ্গে বর্তমান উৎপাদনকেও একই মানে উন্নীত করবে। ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। প্রকল্পের ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে সরকার ঋণ হিসেবে দিচ্ছে ২১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। বাকি ১৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করবে ইআরএল। জানা গেছে, প্রকল্পে বিদেশি ঋণের চেষ্টা করা হলেও কোনো উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বের বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। 

অনুমোদিত ২২ প্রকল্প 
একনেক বৈঠকে অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প রয়েছে তিনটি। এগুলো হলো– কর্ণফুলী টানেলের আনোয়ারা থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের গাছবাড়িয়া পর্যন্ত সংযোগ সড়ক উন্নয়ন, হিলি স্থলবন্দরের ডুগডুগি ঘোড়াঘাট জাতীয় মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীত করতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বিদ্যমান সড়ক কালভার্ট পুনর্নির্মাণ এবং কাঁচপুর-সিলেট-তামাবিল মড়াসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের সংশোধন। 

অনুমোদনের তালিকায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্প রয়েছে। এগুলো হচ্ছে– ঢাকা ওয়াসা প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা একাডেমি স্থাপন, সিলেট সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন, জলবায়ু সহনশীল জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্প, পটুয়াখালী জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত চারটি প্রকল্প হলো– কর্ণফুলী এবং সংযুক্ত নদীগুলোর টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন, সুরমা-কুশিয়ারা নদী অববাহিকার উন্নয়ন, বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এবং ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট প্রকল্প।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এগুলো হলো– মোংলা কমান্ডার ফ্লোটিলা ওয়েস্টের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম সংশোধন ও সাভারে আর্মি ইনস্টিটিউট অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আটটি ১৫ তলা ভবনে ৬৭২টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে। অনুমোদিত অন্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে– কোনাবাড়ীতে দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পুনর্নির্মাণ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের উন্নয়ন ইত্যাদি। 

বৈঠকে পরিকল্পনা উপদেষ্টার পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে অনুমোদিত ১০টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়। ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের সব প্রকল্প পরিকল্পনা উপদেষ্টা অনুমোদনের এখতিয়ার রাখেন। এ জন্য একনেকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। 

 

আরও পড়ুন

×