ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিমত

সরকার দৃশ্যত কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না

সরকার দৃশ্যত কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না
×

নূর খান লিটন

নূর খান লিটন

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২৩ | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৩:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

আর পাঁচ সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেষ তিনটি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এখন যারা যুবক, অর্থাৎ ৪০ বছরের মধ্যে যাদের বয়স, তাদের অধিকাংশই এতদিন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এবার সেই সুযোগটা এসেছে।

তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে সারাদেশে যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন দলের কর্মী হত্যার শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আরেক দলের বাগ্‌যুদ্ধ আমাদের মনে শঙ্কা ধরিয়ে দেয়। সামনে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে, তা নিয়ে আমরা অনিশ্চয়তায় পড়ে যাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ, যাদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো, সেই বাহিনীটি এখন পর্যন্ত পুরো মাত্রায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে– এটা বলার সুযোগও নেই। কারণ এখন আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রেই মব, অর্থাৎ কিছু মানুষ সংগঠিত হয়ে যা ইচ্ছা তাই করছে। একে নিয়ন্ত্রণ করা বা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোথায় যেন একটা দুর্বলতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতর লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সামনে আসছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্রোহী প্রার্থীও আমরা দেখছি, আবার আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও দেখছি। হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও প্রত্যক্ষ করছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা দেখছি। সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে এমন পরিস্থিতি একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের মনে নতুন করে শঙ্কা জাগাচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতির কারণে এই শঙ্কা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। পরিস্থিতি রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যত কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে শিগগিরই যদি উন্নয়ন ঘটানো না যায়, আগামী নির্বাচনের পরিস্থিতি ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এমন অবস্থায় যাবে কিনা, সন্দেহ হয়। শেষ তিন নির্বাচনে ওই অর্থে ভোট হয়নি। ভোট দিতে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছেন। তারা আশাহত হওয়ার শঙ্কায় আছেন।

এবারের নির্বাচন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, একদিকে যেমন জুলাই-আগস্ট-পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের একটা চেষ্টা হবে। অন্যদিকে, জুলাই সনদ নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকবে, যে বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখনও স্পষ্ট কোনো ধারণা পাচ্ছে না। অর্থাৎ, এটা নিয়ে যে প্রচার-প্রচারণা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে করা উচিত, তা অনুপস্থিত। ফলে নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা মজবুত রাখা যাবে, সেই কাঙ্ক্ষিত জুলাই সনদ সম্পর্কে মানুষ স্পষ্ট করে কিছু বুঝতে পারছে না। সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে মানুষ কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না। ফলে এই জায়গাটাতে অনেক দুর্বলতা থেকে যাবে বলে আমার মনে হচ্ছে।

এদিকে, দীর্ঘদিন পর একটা নির্বাচনের সুযোগ এসেছে। আমরা একটা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই, যা হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। আমরা চাই, ‘আমি আমার ভোটটি দেব এবং সেই ভোটটি গোনা এবং সেই ফলটি প্রকাশিত হবে।’ এই জায়গাতে যদি ছেদ ঘটে, তাহলে আশাহত হওয়ার অনেক কারণ থাকবে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের বিশেষ করে বৃহত্তর দলগুলোর আচরণ দেখলে মনে হচ্ছে, তারাই ক্ষমতায় চলে যাচ্ছে। আবার কিছু ব্যবসায়ী ও আমলা এমন কিছু আচরণ করছেন, যা নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত নয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সবচেয়ে জরুরি যে কাজ তা হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করা যে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মী বাহিনীকে সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচনী কার্যক্রমে বহাল রাখবে। কোনো পরিস্থিতিতেই যেন তারা সংঘাতে না জড়ান। কারণ, সংঘাতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির স্থিতিশীলতা আসবে না। যদি একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় এবং মানুষ যদি তার মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে মানুষ নিশ্চয়ই একটা ভালো অবস্থান তৈরি করে দেবে। এতে করে আগামী সংসদ গণতন্ত্র ও দেশ গঠনে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের সময় তারা যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মজবুত ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। তাদের আচরণ যেন পক্ষপাতহীন হয়। তারা যেন এটা না ভেবে বসেন, ‘জনাব এক্স ক্ষমতায় আসছেন, সুতরাং আমি তার পক্ষেই কাজ করব।’ এটা না ভেবে নিরপেক্ষ একটা অবস্থান নিতে হবে। এটা তখনই সম্ভব, যখন নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারে।
জনগণকে সচেতন থাকতে হবে, যাতে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেউ যেন ক্ষতি না করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আমলাদের নিরপেক্ষ রাখতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিরন্তর প্রচেষ্টা করতে হবে। কোনো ব্যত্যয় দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে দায়ী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

#গুম তদন্ত কমিশনের অন্যতম সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×