অভিমত
বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরানো জরুরি
তাসকীন আহমেদ
তাসকীন আহমেদ
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:১০ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্বাচন হলো। এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেবে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরানো নতুন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। পাশাপাশি ব্যবসা সহজ করতে আমূল সংস্কার, সরবরাহ চেইনের উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ভীতির নাম চাঁদাবাজি। শুধু সড়কপথে পণ্য পরিবহনই নয়, শিল্পকারখানা স্থাপন থেকে শুরু করে ব্যবসার নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় নানা স্তরে চাঁদাবাজির ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মনোবল ভেঙে দেয়। নতুন সরকারকে প্রশাসনিকভাবে কঠোর পদক্ষেপের
মাধ্যমে চাঁদাবাজি বন্ধের সুস্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। জেলা ও থানা পর্যায়ের প্রশাসনকে এ ব্যাপারে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারেন।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামো ও কার্যক্রমের সংস্কার। বর্তমানে করদাতা ও এনবিআরের মধ্যে একটি আস্থার সংকট রয়েছে। কর ব্যবস্থাপনাকে সহজ, জটিলতামুক্ত এবং হয়রানিমুক্ত করতে হবে। এনবিআরের রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। নীতি বিভাগ যদি বাস্তবতার নিরিখে কর প্রস্তাব করে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা বিভাগ তা বাস্তবায়নে গতি না আনে বা জটিল করে তোলে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হন।
ঢাকা চেম্বার মনে করে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত, যেখানে কর জটিলতা নিরসন, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা এবং অটোমেশনের মাধ্যমে কর অফিসারের সঙ্গে করদাতার সরাসরি সাক্ষাতের প্রয়োজনীয়তা কমানোর পরিকল্পনা থাকতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগে কর অবকাশ বা প্রণোদনার ঘোষণা এলেও সেগুলো পেতে যেন দুর্ভোগ পোহাতে না হয়, সে নিশ্চয়তা দিতে হবে।
বেসরকারি খাতকে শুধু করদাতা নয়, বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে একটি স্থিতিশীল, নীতিগত এবং অনুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। চাঁদাবাজি বন্ধ এবং এনবিআরের সংস্কারের মাধ্যমে সেই আস্থা অর্জনের পথচলা শুরু হোক। মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আস্থাশীল হয়ে উঠবেন।
ডিসিসিআই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, দেশের অর্থনীতিকে একটি টেকসই এবং শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বর্তমানে দেশ যে বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। একটি সৎ, নিরপেক্ষ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলেই কেবল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে। বিশেষ করে দেশের ক্ষয়িষ্ণু ব্যাংকিং খাত সংস্কারের মাধ্যমে একে পুনরুজ্জীবিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও তারল্য সংকট নিরসনে কঠোর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।
সরকারি সেবা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হলে ব্যবসায়িক ব্যয় কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে। বিশেষ করে, দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের অবহেলার সুযোগ নেই। তাদের বিনিয়োগের মূল স্রোতধারায় আনতে প্রথাগত জটিল ঋণ পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল ডেটা ব্যবহার করে সহজ শর্তে লেনদেনভিত্তিক ঋণ সুবিধা চালু করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সার্ভিস প্রাপ্তি সহজতর করতে হবে, যাতে তারা কোনো বাধা ছাড়াই উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে।
শিল্প খাতের অগ্রগতির জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ এবং দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো গেলে ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং শিল্পের চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাজার– উভয়ই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্কার, ডিজিটাল রূপান্তর এবং একটি স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া দেশে টেকসই বিনিয়োগ বাড়বে না এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও ডিজিটাল অর্থনীতি বিনির্মাণে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা চেম্বার সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে এবং যে কোনো নীতিনির্ধারণী উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
লেখক : সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
- বিষয় :
- অভিমত
