ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

এলএনজি কিনতে বাড়তি ১৭ হাজার কোটি টাকা লাগছে

এলএনজি কিনতে বাড়তি ১৭ হাজার কোটি টাকা লাগছে
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৪২ | আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসের ৭ কার্গো এলএনজি কিনতেই চার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এ জন্য এই খাতের ভর্তুকি বাড়ছে। চলতি বছরে এলএনজি খাতে বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। সরকার আরও ১৭ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। অর্থাৎ ভর্তুকি বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকা। যুদ্ধ না থামলে এ ব্যয় আরও বাড়বে বলে শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। গত বছর এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছিল ৯ হাজার কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল মাসে মোট ৯টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি কার্গোই কেনা হচ্ছে স্পট বাজার থেকে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে। কার্গো যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা থেকে আসবে। স্পট থেকে কেনা প্রতি ইউনিট এলএনজির গড় দাম পড়ছে ২০ থেকে ২১ ডলার, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এ দাম সাধারণত ১০ থেকে ১১ ডলারের মধ্যে থাকে। 

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) একজন কর্মকর্তা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে ১২টি এলএনজি কার্গো কেনার দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। এপ্রিলের জন্য স্পট মার্কেট থেকে কেনা প্রতি কার্গো এলএনজির পেছনে গড়ে ব্যয় হচ্ছে ৮০০ থেকে সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা, যা আগে ছিল সাড়ে ৩০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে।

বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও নির্ধারিত চালান পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল স্পট বাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ‘অনিবার্য পরিস্থিতি’ দেখিয়ে কাতার  আগামী ৮ মে এবং ওমান ১৯ মে সরবরাহ স্থগিত করেছে। 

তবে সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন এরফানুল হক। তিনি বলেন, এপ্রিল মাসের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় এলএনজি আগেই ‘বুক’ করা হয়েছে এবং মে মাসের জন্য ১১টি কার্গো আমদানির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুটই এলএনজি থেকে আসে। যদিও মোট চাহিদা প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ঘনফুট। 

সংকটে ইআরএল, তবে শঙ্কা কম
অপরিশোধিত জ্বালানির তীব্র ঘাটতিতে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় এই সংকটের মুখে পড়েছে জ্বালানি খাত। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও স্বল্প মেয়াদে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি আপাতত সীমিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩১ মার্চ সকাল পর্যন্ত ইআরএলে অপরিশোধিত তেলের মজুত নেমে এসেছে মাত্র ২৩ হাজার টনে, যা দিয়ে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ উৎপাদন চালানো সম্ভব। নতুন চালান না এলে ৭ এপ্রিলের মধ্যেই পরিশোধন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে এক লাখ টনের অপরিশোধিত তেলের চালান আসে। এরপর নতুন কোনো জাহাজ না পৌঁছায় মজুত দ্রুত কমে গেছে। চলতি মাসে সৌদি আরব থেকে এক লাখ টনের একটি জাহাজ  আসার কথা থাকলেও হরমুজ জটিলতায় তা আটকে যায়।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংকট প্রকট হতে পারে। প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইআরএল বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা কম। কারণ বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা মূলত পরিশোধিত তেল আমদানিনির্ভর। ইআরএল দেশের মোট জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং ডিজেলের মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ (মাসে ৬০ হাজার টন) সরবরাহ করে। ফলে আমদানি স্বাভাবিক থাকলে বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাসে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে এপ্রিল মাসের জন্য আমদানির মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও ৬০ হাজার টনের প্রক্রিয়া চূড়ান্তের পথে। পাশাপাশি ডিপোগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন মজুত রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট সরবরাহ চাহিদার প্রায় ৮৬ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম।

পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। দেশে মাসে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টন, যা প্রায় পুরোপুরি দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করেই পূরণ করা হয়। সিলেটের সরকারি প্ল্যান্ট থেকে প্রায় ১২ হাজার টন এবং বেসরকারি প্ল্যান্ট থেকে ১৮ থেকে ২০ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহ আসে। ফলে পেট্রোলের ক্ষেত্রে ইআরএলের ভূমিকা সীমিত, এবং এটি বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।

অন্যদিকে, অকটেনের মাসিক চাহিদা প্রায় ৩৫ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, বাকি ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এখানে ইআরএল সরাসরি বড় উৎপাদক না হলেও ন্যাফতা সরবরাহের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

ইআরএল মাসে প্রায় দুই লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে, যেখান থেকে ন্যাফতাসহ বিভিন্ন উপাদান উৎপাদিত হয়। ফলে রিফাইনারি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ন্যাফতার ঘাটতি তৈরি হয়ে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনে চাপ বাড়তে পারে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়বে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। সম্প্রতি ২৫ হাজার টন অকটেনবাহী একটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে এবং আরও একটি চালান আসার কথা রয়েছে। এতে করে দেড় মাসের বেশি সময়ের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, তিনটি তেলবাহী জাহাজ দেশের পথে রয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও পৌঁছানোর সময় এখনও অনিশ্চিত। কর্মকর্তাদের আশা, এসব চালান সময়মতো এলে ইআরএলের উৎপাদন দ্রুত স্বাভাবিক হবে।

আরও তেল কিনছে সরকার
আন্তর্জাতিক তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে ১৭ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করবে সরকার। আগামী শনিবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।

প্রস্তাব অনুসারে ডিবিএস ট্রেডিং হাউস এফজেডসিওর কাছ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১০ লাখ টন (ইএন ৫৯০-১০ পিপিএম) মানের ডিজেল এবং এক লাখ টন অকটেন আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। একই সভায় ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এক লাখ টন ৫০ পিপিএম সালফার মানের ডিজেল আমদানির প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। অন্যদিকে, কাজাখস্তান গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট এলএলপির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পাঁচ লাখ টন ডিজেল  আমদানির প্রস্তাবও সভায় উপস্থাপন করা হবে।

এ আগে ২৬ মার্চ  তিন লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা কমিটি। এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে এক লাখ টন এবং সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে দুই লাখ টন ডিজেল কিনতে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। গত ৩১ মার্চ দুই লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এক লাখ টন ক্রুড অয়েল কেনা হবে সরাসরি আন্তর্জাতিক  ক্রয় পদ্ধতিতে। স্থানীয় আবির ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটসের কাছ থেকে তা কেনার অনুমোদন দেয় কমিটি। ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো জাপিন নামের কোম্পানি থেকে ৬০ হাজার টন ডিজেল এবং ইউরোপীয় মানের এক লাখ টন ডিজেল কেনা হবে সরবরাহকারী এক্সনমোবিল কাজাখস্তান ইনকরপোরেটেডের (ইএমকেআই) কাছ থেকে। 

অভিযান ও মজুত
সারাদেশে এক দিনে অভিযান চালিয়ে আরও ২৫ হাজার ৫৩৭ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বলেছে, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট তিন লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হলো। গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত ৬৪ জেলায় মোট চার হাজার ৮২৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

গতকাল  বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বুধবার ৩৮১টি অভিযান চালানো হয়। মামলা হয় ১৬৯টি। মোট আট লাখ ৮৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২৫ হাজার ১৩২ লিটার ডিজেল, ১০ লিটার অকটেন ও ৩৯৫ লিটার পেট্রোল জব্দ করা হয়েছে এসব অভিযানে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, এখন পর্যন্ত মোট দুই হাজার ৯টি মামলা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে এক কোটি এক লাখ ৪৩৫ টাকা। কারাদণ্ড পেয়েছেন ২৪ জন। এখন পর্যন্ত মোট ডিজেল উদ্ধার হয়েছে দুই লাখ ৭১ হাজার ৩৭৪ লিটার। অকটেন ৩০ হাজার ৯৬০ লিটার। পেট্রোল ৭০ হাজার ৫৪ লিটার।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে মোট দুই লাখ ৫৫ হাজার ১৮ টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মজুতকৃত তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ডিজেল, যার পরিমাণ এক লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন। এ ছাড়া কেরোসিন রয়েছে ৯ হাজার ৩৭৮ টন, অকটেন ৯ হাজার ২১ টন এবং পেট্রোল ১২ হাজার ১৯৪ টন। এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েল মজুত রয়েছে ৫৮ হাজার ৭৩৬ টন। পাশাপাশি বিমান পরিবহনে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল রয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৬ টন এবং নৌপরিবহনের জন্য মেরিন ফুয়েল মজুত রয়েছে এক হাজার ১৫৩ টন।

আরও পড়ুন

×