জামায়াত আমিরের এক্স আইডি হ্যাকড
ডিভাইস চেয়ে চারবার চিঠি, সাড়া মেলেনি
ডা. শফিকুর রহমান
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স আইডি হ্যাক মামলার প্রায় আড়াই মাস পার হলেও তদন্তের তেমন অগ্রগতি নেই। কম্পিউটার ডিজিটাল ডিভাইসে বেআইনিভাবে ঢুকে অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগে দলটির তরফে প্রথমে হাতিরঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি), পরে মামলা করা হয়।
মামলাটির তদন্ত করছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-দক্ষিণ ইউনিট। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা এক্স কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দিলেও সাড়া মেলেনি। এক্স কর্তৃপক্ষ তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তির অ্যাকাউন্টের তথ্য নিতে হলে দুদেশের আদালতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে সেই ডিভাইসসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা জরুরি। তাই তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রেজাউল আমীন মামলার বাদী সিরাজুল ইসলামকে ডিভাইসসহ অন্য আলামত জব্দের ব্যাপারে চারবার চিঠি দিয়েছেন।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মামলার বাদীর কাছে চিঠি দিয়ে ডিভাইস চেয়েছি। কিন্তু তারা ডিভাইস জমা দেননি। পরে আদালতের মাধ্যমেও ডিভাইস চাওয়া হলেও পাওয়া যায়নি। এতে তদন্তের অগ্রগতি থমকে আছে।
অভিযোগ প্রমাণের জন্য ওই ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করা জরুরি– এমন প্রশ্নে শফিকুল ইসলাম বলেন, ডিভাইসই তো প্রধান জিনিস। ওটা না পেলে ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করা কঠিন।
জানা গেছে, জিডির তদন্ত শুরুর পরই অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগে বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমকে ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর এজিবি কলোনির বাসা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আটক করে। জব্দ করা হয় তার মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ। জিডির তদন্ত কাজ শুরু করেছিল ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিট, অথচ ছরওয়ারে আলমকে আটক করে ডিবির অন্য একটি ইউনিট। পরে তাকে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে আনা হলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানতে পারেন।
প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর, ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টায় মিন্টো রোডে সংবাদ সম্মেলনে ছরওয়ারে আলমকে মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানায় ডিবি। এদিন রাতে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্স আইডি হ্যাক হওয়ার বিষয়ে ছরওয়ারে আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। যথেষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জামায়াত আমিরের তরফে করা মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জন কম্পিউটার ডিজিটাল ডিভাইসে বেআইনি প্রবেশে করে ডা. শফিকুর রহমানের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্ট করে, যা নারীর প্রতি বিদ্বেষ, অশ্লীলতা, জাতিগত সহিংসতা, ঘৃণা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়ায়।’
তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরে একটি ‘ফিশিং মেইল’ আসে ছরওয়ারে আলমের সরকারি ই-মেইলে। সেটা তিনি ক্লিক করেন। এই ক্লিকের কারণে তার ই-মেইল অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। অবশ্য তার ব্যবহৃত ডিভাইস বঙ্গভবন থেকে জব্দ করা হয়েছে। জামায়াতের অভিযোগ, গত ১০ জানুয়ারি বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের ব্যবহৃত সরকারি ই-মেইল থেকে জামায়াতে আমিরের ই-মেইলে ‘নির্বাচন-সংক্রান্ত জরুরি তথ্য’ শিরোনামে মেইল আসে। সরকারি ই-মেইল হওয়ায় আমিরের একটি ডিভাইস থেকে মেইলের অ্যাটাচমেন্ট খোলা হয়। এই ‘ফিশিং অ্যাটাচমেন্টে’ ক্লিকের কারণে ওই ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের কাছে চলে যায় বলে জামায়াতের দাবি।
তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের ওই মেইলের কারণে হ্যাক হয়েছে কিনা, নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জামায়াতের কাছে মেইল গেছে কিনা– এ বিষয়ে এজাহারের সঙ্গে সংযুক্ত স্ক্রিনশর্ট ছাড়া তদন্তে অন্য কোনো তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
মামলার বাদী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে জামায়াতে ইসলামীর সেই সময়ের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আইটি টিমের সদস্য তারিক আহমেদ প্লাবনের সঙ্গে গতকাল বুধবার ফোনে কথা হয়। তিনি মামলার বিষয়ে অবগত আছেন জানিয়ে বলেন, ডিভাইসগুলো নেওয়ার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা কয়েকবার চিঠি দিয়েছেন। আমরা তাদের ডিভাইসের সুরক্ষার বিষয়টি জানিয়েছি, তৃতীয় কোনো নির্ভরযোগ্য পক্ষ বা কোম্পানির মাধ্যমে ডিভাইস নিয়ে ফরেনসিক পরীক্ষা করতে হবে। পুলিশকে দেব না। কারণ, আমরা তাদের সেভাবে বিশ্বাস করতে পারছি না।
এদিকে গ্রেপ্তারের পর ছরওয়ারে আলমকে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে হাজির করলে ওই দিনই তিনি জামিন পান। হ্যাকের অভিযোগ ওঠায় তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিনি গতকাল সমকালকে বলেন, ‘আমার ডিভাইস হ্যাক হয়েছিল কিনা, সেটির ধারণা পাইনি। আমি কোনো মেইল পাঠালে সেটির তো প্রমাণ থাকবে ডিভাইসে। আমার ব্যবহৃত সব ডিভাইস ডিবির সাইবার টিমকে দিয়েছি, তারা ফরেনসিক পরীক্ষা করে দেখুক।’
- বিষয় :
- ডা. শফিকুর রহমান
