বন্ধ পাট ও বস্ত্রকল চালু এক বছরে
ডিসি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ১০:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের ৫০টি বন্ধ পাট ও বস্ত্রকল এক বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল সোমবার এসব কথা বলেন তিনি।
ডিসিরা নিজ নিজ জেলার বাস্তবতা তুলে ধরে শিল্প পুনরুজ্জীবন, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং বন্ধ চিনিকল চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। বস্ত্র ও পাট খাতের প্রায় ৫০টি বন্ধ ও রুগ্ণ কারখানাকে পর্যায়ক্রমে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কার্য অধিবেশনে প্রস্তাবগুলো দেওয়া হয়। গতকাল ২৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কিত ডিসিদের লিখিত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সচিবরা।
অধিবেশন শেষে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের ৫০টি বন্ধ পাট ও বস্ত্রকল পুনরায় চালুর কাজ এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। চলতি বছরের মধ্যেই আরও ছয়টি কারখানা চালু করা হবে। ইতোমধ্যে কিছু মিল ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং বাকি মিলগুলো দ্রুত বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হবে। ডিসিদের প্রস্তাবগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে বলেও জানান তিনি। যেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা থাকবেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘জেলা প্রশাসকদের কাছে আমরা একটি জিনিস চেয়েছি– দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে তারা যেন নজরদারি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখেন।’ তিনি জানান, প্রশাসন ও নির্বাচিত সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করে কীভাবে কার্যকরভাবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়েও অধিবেশনে আলোচনা হয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদক পর্যায়ের মূল্য ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান– যা কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া গত ৫০-৫৫ বছরে বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একটি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনকে একটি এআই জেনারেটেড মডেলের আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বাজার পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে।’
একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর পণ্যের জন্য কৌশলগত মজুত (স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ) গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পর্যাপ্ত স্টোরেজ সুবিধা নেই। আমরা এমন ব্যবস্থা করতে চাই, যাতে তেল-চিনির মতো পণ্য এক থেকে দুই মাস মজুত রাখা যায়। তাহলে কোনো গোষ্ঠী কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারবে না।’
খাল দখল করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, কেউ খাল দখল করলে দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে, যা আগামী ৫ বছরে সমাপ্ত করা হবে। এ বিষয়ে আমরা ডিসিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছি।
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘খালের প্রবাহ ঠিক রেখে আমরা যখন কাজ করতে যাব, ওর মধ্যে কোনো দোকান পড়লে তা ভেঙে ফেলা হবে বা মাছের ঘের বানিয়ে যদি খাল আবদ্ধ রাখে, তাহলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, দীর্ঘদিন খাল খনন কর্মসূচি বন্ধ ছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেভাবে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, তা একটা বিপ্লব ছিল। আজ নতুনভাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তা নতুন আঙ্গিকে শুরু করেছেন। খাল হচ্ছে জনগণের সম্পত্তি। খাল যেদিক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সেটি বড় করতে যাওয়ার সময় যদি কোনো দখলদার পড়ে, তাকে সরে যেতে হবে। কেউ ইচ্ছা করলে আবার এসে খাল দখল করতে পারবে না। তার পরও এমন কিছু ঘটলে ডিসিরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এ সময় দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সড়কে শৃঙ্খলায় ডিসিদের সহযোগিতা লাগবে
অধিবেশন শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের আরও সক্রিয় ভূমিকা চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে ডিসিদের কার্যকর ভূমিকার ওপর। মন্ত্রী বলেন, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, যা সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের সমস্যা, প্রত্যাশা ও প্রস্তাবনা শুনে সমাধানের উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বগুড়ায় পাইলট তৈরির ‘ফ্লাইং একাডেমি’ হবে
বগুড়ায় বিমানবন্দরের পাশাপাশি পাইলট তৈরির ‘ফ্লাইং একাডেমি’ স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধিবেশন শেষে তারা এ কথা বলেন।
পর্যটনমন্ত্রী বলেন, ‘সৈয়দপুর (বিমানবন্দর) নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছি। বেশ কিছু বিমানবন্দর চালুর ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; ঠাকুরগাঁও, তারপর বগুড়া। আমরাও চাচ্ছি বগুড়ায় এয়ারপোর্ট হবে। পাশাপাশি ওখানে আমরা ফ্লাইং একাডেমিও করতে চাচ্ছি, যাতে আমরা পাইলট বানাতে পারি। আমাদের অনেক পাইলটের প্রয়োজন। গরিব, মেধাবী ছাত্রদেরও পাইলট হওয়ার ইচ্ছা থাকলে তারা সেখানে পড়াশোনা করতে পারবে।’
উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষুব্ধ জোনায়েদ সাকি
উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি ও দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেছেন, অতীতে যেভাবে ঢিলেঢালাভাবে প্রকল্প চলেছে, বর্তমানে আর সেই সুযোগ নেই। সরকারের প্রতিটি পরিকল্পনার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। সেই সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করতে হবে।
ডিসি সম্মেলনে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা দূর করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গঠন নয়; সেই অর্থনীতিতে বৈষম্য কমিয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। জনগণের বিপুল আস্থা ও সমর্থন নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকারের পরিষ্কার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসন, বিশেষ করে জেলা প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সান্ধ্যভোজ
সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জেলা প্রশাসকরা। সাক্ষাৎ শেষে স্পিকারের সঙ্গে রাতের খাবার খান তারা।
- বিষয় :
- ডিসি সম্মেলন
- পাট
- বস্ত্রকল
