ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মতবিনিময় সভা
স্থিতিশীলতার জন্য শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষা কারিকুলাম ঢেলে সাজানো সময়ের দাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাত নেড়ে শিক্ষার্থীদের অভিবাদনের জবাব দেন। গতকাল মঙ্গলবার অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে - পিআইডি
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৮:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে নিয়োগ হয়নি। রাজনৈতিক পক্ষপাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমরা যদি মেধা দেখে নিয়োগ দিতে পারি, তাহলে পরিবর্তন আনা সম্ভব। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। দেশকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তিনি শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চেয়েছেন। এদিকে, উচ্চশিক্ষাবিষয়ক এক কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী ঘণ্টাব্যাপী শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন, লাইব্রেরি, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করেন। শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের দেখে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, ৩৫ বছর আগে ফিরে গিয়েছি। আমি জানতে চাই, কেমন বাংলাদেশ আপনারা দেখতে চান? আপনারা দেশের ভবিষ্যৎ। আমি বেশি বলার চাইতে আপনাদের থেকে বেশি শুনতে চাই।
হলে সিট সমস্যা এবং চাকরিতে স্বজনপ্রীতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কমবেশি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সমস্যাগুলো আছে। ২০০৮ সালের পর থেকে দেশে অনেক বড় বড় প্রকল্প হয়েছে। দেশের জন্য প্রকল্পের প্রয়োজন আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে খরচ পড়ছে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কাছাকাছি পাওয়ার স্টেশন হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকায়, অর্থাৎ তিন গুণ বেশি খরচ হচ্ছে। প্রত্যেক মানুষের ওপর এই টাকার বোঝা এসে পড়েছে। সেখানে বালিশ কেনা হয়েছে ৮০ হাজার টাকায়, যেটার দাম দেড়-দুই হাজার টাকার বেশি নিশ্চয়ই হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি শ্বেতপত্র হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই টাকা যদি দেশে থাকত, তাহলে আমরা হলগুলোর এই সংকট সমাধান করতে পারতাম। তিনি বলেন, আমরা পরিবর্তন নিয়ে এলে অনেক কিছু করতে পারব।
কর্মসংস্থান এবং একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত বিশ্বে ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন রয়েছে। আমরা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে চাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে উপদেষ্টা মাহদী আমিন প্রশ্নটির জবাবে বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের প্রায়োগিক জ্ঞান বৃদ্ধিতে চতুর্থ বর্ষের একটি সেমিস্টারে ইন্ডাস্ট্রিতে ইন্টার্নশিপ বাস্তবায়ন করতে চাই। এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যেসব ইন্ডাস্ট্রি ইন্টার্নশিপ দেবে, তাদের পলিসিগত সুবিধা দেওয়া হবে।
তৃতীয় ভাষা শিক্ষার কার্যক্রম সরকারের বর্তমান মেয়াদেই দেখা যাবে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমাদের ছয় মাস থেকে এক বছরের মতো সময় লাগবে। কারণ, এত শিক্ষক পাওয়া খুব কঠিন। আমরা যে ভাষা শেখাব, তা ভিডিও ফরম্যাটে নিতে চাচ্ছি। এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার স্কুল পর্যায় থেকেই তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। ইংরেজির পাশাপাশি চীনা, জাপানি, ফরাসি, জার্মানসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা হবে। ভবিষ্যৎ কর্মবাজারে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ভাষা শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ও শিক্ষকদের সাদা দলের আহ্বায়ক ড. মোর্শেদ হাসান খান প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ্ আল মামুন।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে মনোযোগী হতে আহ্বান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষের রূপরেখা’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ও গবেষণায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক মান বজায় রাখতে পারছে কিনা– এমন একটি প্রশ্ন অনেকের আলোচনায় ফুটে উঠেছে। দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানের উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে র্যাঙ্কিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনও প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কর্মসংস্থানের নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হলে আমাদের মুখস্থ বিদ্যা ও সার্টিফিকেট-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম ঢেলে সাজানো সময়ের দাবি। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ক্রেস্ট উপহার দেন কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে কর্মশালায় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক, ইউজিসির সচিব ফখরুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
- বিষয় :
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
