ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধান

বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে একগুচ্ছ সুবিধা

বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে একগুচ্ছ সুবিধা
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৮:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আবারও বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির এক যুগের বেশি সময় পরও বঙ্গোপসাগরের বিপুল সম্পদ আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় নতুন করে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আগামীকাল রোববার সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করবে পেট্রোবাংলা।

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, এবারের দরপত্র আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় করতে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এ বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য করছাড়, শতভাগ মুনাফা দেশে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ, রয়্যালটি অব্যাহতি, গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণসহ নানা সুবিধা রাখা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব সমকালকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি, রোববার সমুদ্রের সবগুলো ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে পারব।’
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, মোট ২৬টি অফশোর ব্লক দরপত্রের আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে এসএস-০১ থেকে এসএস-১১ পর্যন্ত ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক এবং ডিএস-০৮ থেকে ডিএস-২২ পর্যন্ত ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক রয়েছে। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো এককভাবে অথবা যৌথ উদ্যোগে এক বা একাধিক ব্লকের জন্য আবেদন করতে পারবে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, অতীতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আপত্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই নতুন পিএসসি তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয়, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অংশগ্রহণ এবং অনুসন্ধান ব্যয়ের পুনরুদ্ধার ইস্যুতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালার খসড়া অনুযায়ী, বিদেশি ঠিকাদার কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা পুরোপুরি নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে। কোনো সিগনেচার বোনাস বা রয়্যালটি দিতে হবে না। এমনকি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট আয়করও পরিশোধ করবে পেট্রোবাংলা। অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন পর্যায়ে আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি ও মেশিনারির ওপর শুল্ক অব্যাহতির সুবিধাও থাকছে।
গ্যাসের মূল্য নির্ধারণেও আনা হয়েছে নতুন কাঠামো। আগে উচ্চ সালফার ফুয়েল অয়েলের সঙ্গে মূল্য নির্ধারণ করা হলেও এখন তা ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম নির্ধারণ হবে তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্টের সর্বনিম্ন মূল্য ধরা হয়েছে ৭০ ডলার এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, অগভীর ও গভীর সমুদ্র উভয় ব্লকের ক্ষেত্রেই শতভাগ কস্ট রিকভারি সুবিধা রাখা হয়েছে, যদিও বছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় পুনরুদ্ধার করা যাবে। অনুসন্ধান পর্যায়ে আগের মতো ৫০ শতাংশ এলাকা ছেড়ে দিতে হবে না; এখন মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা ত্যাগ করতে হবে।
এ ছাড়া শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাইপলাইন ট্যারিফ এখন দরদাতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামো বিনিয়োগের পূর্ণ ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন দরপত্রে একটি টেন্ডার শিডিউল কিনেই একাধিক ব্লকে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি ব্লকের জন্য আলাদা আবেদন জমা দিতে হবে। পাশাপাশি পরস্পর-সংলগ্ন দুটি গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য একক চুক্তির আওতায় আবেদন করার সুযোগও থাকবে।

দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী কোম্পানিকে অন্তত একটি অফশোর ব্লকের অপারেটর হতে হবে এবং প্রতিদিন ন্যূনতম ১০ হাজার ব্যারেল তেল বা ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের দরপত্র আগের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আকৃষ্ট করা। এ জন্য রোডশো, বিদেশি দূতাবাসে চিঠি পাঠানোসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুন থেকে প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর। এ সময়ের মধ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলো বঙ্গোপসাগরের জরিপ তথ্য-উপাত্ত কিনতে পারবে।

এর আগে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কোম্পানি প্রস্তাব জমা দেয়নি। যদিও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তথ্য-উপাত্ত কিনেছিল। পরে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মতামত নিয়ে পেট্রোবাংলা একটি পর্যালোচনা করে এবং নতুন পিএসসিতে একাধিক সংশোধন আনে।
বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রের ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লক রয়েছে। অতীতে মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস, অস্ট্রেলিয়ার স্যান্টোস ও দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো দাইউ কাজ শুরু করেও সরে যায়। ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসিও সর্বশেষ তাদের ব্লক ছেড়ে দিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশোধিত পিএসসিতে আনা পরিবর্তনগুলো বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগবান্ধব। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করা গেলে বঙ্গোপসাগরের বিপুল সম্ভাবনাময় জ্বালানি সম্পদ দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

আরও পড়ুন

×