কমবে অপচয় বাড়বে আয়
সৌরচালিত দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার আসছে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানিকগঞ্জের মেদুলিয়া এক সময় লোকসানি সবজি চাষের গ্রাম ছিল। মৌসুমে ফুলকপি ও বাঁধাকপির এত উৎপাদন হতো যে, দেড় কেজির একটি কপিও বিক্রি হতো মাত্র আড়াই থেকে তিন টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। গ্রামের পাশে স্থাপিত একটি ক্ষুদ্র হিমাগার (মিনি কোল্ডস্টোরেজ) বদলে দিয়েছে স্থানীয় কৃষির অর্থনীতি। ২০ জন কৃষককে নিয়ে গঠিত সমিতি এখন এটি পরিচালনা করছে। বাজারে দাম কম থাকলে কৃষকরা সবজি সংরক্ষণ করেন, চাহিদা বাড়লে ঢাকার পাইকারি বাজারে পাঠান। ফলে এক সময় লোকসানে জর্জরিত মেদুলিয়া এখন কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বিপণনের একটি ছোট অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মেদুলিয়ার মতো সাফল্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অন্তত ১৪০টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় নির্মাণ হয়েছে ফার্মার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে এমন অভিজ্ঞতাই সরকারকে আরও বড় পরিকল্পনা নিতে উৎসাহিত করেছে। এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশে দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষকের জমির কাছেই গড়ে তোলা হবে এসব সংরক্ষণাগার। সরকারের আশা, এতে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে। কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর বনানীতে এক অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বর্তমানে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের বড় হিমাগারগুলো অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের জমি থেকে ২৫ থেকে ৩০ মাইল দূরে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন না। নতুন পরিকল্পনায় কৃষকের বাড়ির কাছেই কিংবা মাঠের পাশে ছোট ছোট হিমাগার নির্মাণ করা হবে।
মন্ত্রী জানান, এসব হিমাগার সম্পূর্ণ সৌর বিদ্যুৎচালিত হবে। প্রতিটি হিমাগার পরিচালনার জন্য ১৫ থেকে ২০ জন কৃষককে নিয়ে সমবায়ভিত্তিক কমিটি গঠন করা হবে। পাইলট প্রকল্পে আমরা খুব ভালো ফল পেয়েছি। এখন এটিকে বড় পরিসরে সম্প্রসারণের সময় এসেছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণ করা গেলে অন্তত ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর বাইরেও এর প্রভাব বিস্তৃত হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০০টি ফারমার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করা হয়। এই উদ্যোগ সফল হওয়ায় দ্বিতীয় ধাপে ৮০টি কনটেইনারভিত্তিক সৌরচালিত ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে ৪০টির বেশি নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। গত বছর জুনে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে শুরু হওয়া প্রকল্পটি এখন কৃষি খাতে অন্যতম আলোচিত সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেসব এলাকায় ক্ষুদ্র হিমাগার স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে কৃষক সরাসরি সুফল পাচ্ছেন। টমেটো, ফুলকপি, মরিচ, লাউ, বেগুন, ড্রাগন ফল, আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এক মাসেরও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে এসব হিমাগারে।
কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগারে নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে নতুন প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। নতুন প্রকল্প শুধু হিমাগার নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে গ্রেডিং, সোর্টিং, প্যাকেজিং, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সোলার এয়ারফ্লো প্রযুক্তিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ, সোলার ফ্রুট ড্রায়ার এবং ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধাও যুক্ত করা হতে পারে।
‘ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাসরুর বলেন, কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতেই কৃষিমন্ত্রী নতুন প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে, খাদ্যের মূল্য ওঠানামা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। বিদ্যুৎনির্ভর বড় অবকাঠামোর তুলনায় এসব ক্ষুদ্র হিমাগার পরিবেশবান্ধব, কম ব্যয়বহুল এবং গ্রামীণ বাস্তবতার সঙ্গে বেশি উপযোগী।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ক্ষুদ্র হিমাগার প্রযুক্তি বিস্তৃত হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
- বিষয় :
- হিমাগার
