খুন, ধর্ষণ, মব সহিংসতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
কোলাজ
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ | ০৭:১৩
খুন, ধর্ষণ, মব, গণপিটুনি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ প্রতিদিনই ঘটছে। দেশের মানুষের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক ও ভীতিকর বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তবে পুলিশ বলছে, তারা পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা তো বটেই, এমনকি কবর থেকে মরদেহ তুলে পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। স্মরণকালের ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই। সে তুলনায় নতুন সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এখনও পুরোপুরি ফেরেনি।
পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামিনে মুক্তি পাওয়া বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দাগি অপরাধী চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। তিনি ২০০১ সালে প্রকাশিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ১২ এপ্রিল দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে অ্যালেক্স গ্রুপের নেতা মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমন নিহত হন। চার দিনের মাথায় একই এলাকায় আরেক যুবক খুন হন।
৩ মে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় একাধিক ব্যক্তিকে ট্রাকচাপা দেওয়ার গুজব রটিয়ে হান্নান শেখ নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৯ মে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাগচালা এলাকায় গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে তিনজনের মৃত্যু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সরকার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখাতে পারলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং তা ধরে রাখা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বাহিনীর সদস্যদের অনেক সময় হামলার শিকার হতে হচ্ছে, এমনকি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়েই ফিরে আসতে হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
পাঁচ মাসে ১,৪৫২ খুনের মামলা
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে সারাদেশে খুনের ঘটনায় এক হাজার ৪৫২টি মামলা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ঘটনায় একাধিক মানুষ খুন হলেও হত্যা মামলা হয় একটি।
একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের সাত হাজার ৯১০টি, অপহরণের ৪৩৭টি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ৮৫৮টি এবং মাদক-সংক্রান্ত ২৬ হাজার ১৪১টি মামলা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মামলা হয়েছে চার হাজার ৯১২টি।
আগের বছর একই সময়ে খুনের মামলা হয়েছিল এক হাজার ৫৮৭টি। এই পরিসংখ্যানে আগের খুনের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ৯ হাজার ১০০টি এবং চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ছিল চার হাজার ৯৫৫টি।
মব সহিংসতায় শতাধিক প্রাণহানি
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১৯৮টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে এপ্রিলে ৪৪টি ঘটনায় ২২ জন ও মে মাসে ৬৬টি ঘটনায় ৩১ জন প্রাণ হারান।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ মাসে ৭৭২টি রাজনৈতিক সংঘাতে ৯৬ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে এক হাজার ২৬৯ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ধর্ষণের শিকার ২৯৮ জন। বিভিন্ন কারণে প্রাণ হারিয়েছে ২৫১ শিশু।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৮৯ জন। একই সময়ে ২৩৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৮৫ জনকে। ধর্ষণ-সংক্রান্ত ঘটনায় ২৬ নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ মাসে এক হাজার ৩৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫১ শিশু ও ৫৮৪ নারী। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৫০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে ২৩৭ নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছেন।
হামলার শিকার র্যাব, পুলিশ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও বাড়ছে। গত মে মাসে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় ১৩টি স্থানে হামলার শিকার হন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা।
২০ মে রাজধানীর পল্লবীর কালশীতে সরকারি জমি থেকে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ অভিযানে গেলে পুলিশের ওপর হামলা হয়। পরদিন চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দারা ছয় ঘণ্টা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং একটি পুলিশ পিকআপে আগুন ধরিয়ে দেন।
২২ মে সিলেটে এক মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে র্যাব সদস্য ইমন আচার্য নিহত হন। এর দুদিন আগে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন এক পুলিশ সদস্য।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক সদস্য এখনও পুরোপুরি মনোবল ফিরে পাননি। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো জটিলতায় পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমর্থন পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
নানা পেশার মানুষ উদ্বিগ্ন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুমিল্লা জেলায় কর্মরত একজন সরকারি কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেন, সামাজিক মাধ্যমে মাঝেমধ্যেই ছিনতাইয়ের ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়। ছিনতাইকারীদের হাতে চাপাতি, আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। এগুলো জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। নিরাপত্তাহীনতার বোধ সবাইকে তাড়া করে।
রাজধানীর পল্লবীর বাসিন্দা ফেরদৌস সুলতান বলেন, মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা যেন দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। সারাদেশে এত খুনখারাবি হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অনেক খুন হচ্ছে দিনদুপুরে; প্রকাশ্যে গুলি চালায় অপরাধীরা। কিছুদিন আগে পল্লবীতে আট বছরের এক মেয়েকে ধর্ষণের পর মাথা বিচ্ছিন্ন করা হলো।
ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আবদুর রহিম সমকালকে বলেন, এর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো মব সন্ত্রাস। কিছু হলেই শত শত লোক জড়ো হয়ে হামলা-ভাঙচুর চালায়, এমনকি লোকজনকে পিটিয়ে হত্যা করে। এটি মেনে নেওয়া যায় না। এটি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। আশা করেছিলাম, রাজনৈতিক সরকার আসার পর এই মব কালচার বন্ধ হবে। কোনো মানুষ অপরাধ করলে তার বিচার হবে। মানুষ কেন আইন নিজের হাতে তুলে নেবে?
উদ্বেগের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, গত পাঁচ মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি সন্তোষজনক বলা যায় না। বিশেষ করে গণপিটুনির ঘটনা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, রাষ্ট্রকে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে নাগরিকরা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। প্রচলিত আইনে বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করেই কেবল একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরিস্থিতির উন্নতির দাবি পুলিশের
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। তবে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
রফিকুল ইসলাম বলেন, কিছু এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার যে প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পুরোপুরি কাটতে সময় লাগবে। মানবাধিকার বিবেচনায় পুলিশ সদস্যরা আগের তুলনায় বেশি সংযত থাকায় অপরাধীরা অনেক সময় সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
