ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ঘর-বাড়ি, ফসল হারিয়ে আতঙ্কে হাজারো পরিবার

ঘর-বাড়ি, ফসল হারিয়ে  আতঙ্কে হাজারো পরিবার
×

সুন্দরগঞ্জের শ্রীপুর ইউনিয়নে ভাঙনকবলিত পুঠিমারি গ্রাম সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

পানি কমতে শুরু করলেও গাইবান্ধা ও বগুড়ার ধুনটে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কয়েক সপ্তাহে শত শত বিঘা আবাদি জমি, বসতভিটা, গাছপালা ও ফসল নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে ঘর সরিয়ে বাঁধ কিংবা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিচ্ছেন অনেক পরিবার। স্থানীয়দের অভিযোগ, জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থায়ী নদীশাসনের অভাবে প্রতিবছরই একই দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের পুঠিমারি গ্রামের জেলেখা বেগম চার দফা নদীভাঙনে সব হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখন একটা ঘর ছাড়া আর কিছুই নেই। এক ছেলে কাজের জন্য ঢাকায় গেছে। নদী কতবার ঘরবাড়ি, জমিজমা কেড়ে নিয়েছে, তা বলে শেষ করা যাবে না।’

সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে কচুক্ষেত, পাটক্ষেত, গাছপালা ও আবাদি জমি মুহূর্তেই নদীতে চলে যাচ্ছে। কোথাও নদী এসে পৌঁছেছে বসতঘরের দোরগোড়ায়। আতঙ্কে অনেক পরিবার আগেভাগেই ঘর সরিয়ে নিচ্ছে।
কৃষক সৈয়দ জামাল জানান, দুই বছর আগেও তাঁর প্রায় ১০০ বিঘা জমি ছিল। এখন ৭০-৮০ বিঘা নদীতে বিলীন হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ‘হাজার হাজার জিও ব্যাগ প্রয়োজন, অথচ কয়েকটি ফেলে দায় সারছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।’

একই এলাকার কৃষক আমজাদ হোসেন চলতি মৌসুমে ২০-২৫ বিঘা জমিতে কচু চাষ করেছিলেন। কয়েক দিনের ভাঙনে সব নদীতে চলে গেছে।
শ্রীপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম বলেন, গত দুই মাসে তাঁর ইউনিয়নে প্রায় ৩০০ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে এবং ৭০-৭৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফুলছড়ি উপজেলার পূর্ব রসুলপুরেও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে নদীতে বিলীন হওয়া গ্রামটি নতুন চর জেগে ওঠার পর আবার বসতি গড়ে উঠেছিল। এবার সেই জনপদও হুমকিতে। 

কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সোহেল রানা সালু জানান, ইতোমধ্যে শতাধিক বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়েছে এবং ৫০টির বেশি পরিবার ঘর সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলায় ৮৩০ কোটি টাকার নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ চলছে। পাশাপাশি ২৯টি পয়েন্টে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জেলায় ১১৬ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন এবং বন্যায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে আগামী শুকনো মৌসুমে স্থায়ী কাজ শুরু করা হবে।
অন্যদিকে বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের শহরাবাড়ি থেকে বানিয়াযান স্পার পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় যমুনার ভাঙন তীব্র হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ১২টি গ্রামের মানুষ।
বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের নিয়ে ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তিনি আতঙ্কিত এলাকাবাসীর উদ্দেশে বলেন, বর্তমানে অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ও জিও টিউব ফেলে নদীভাঙন প্রতিরোধের কাজ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন । আগামী শুষ্ক মৌসুমে কাজ শুরু করা হবে। 
স্থানীয় বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম নান্নু মণ্ডল অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন আরও ভয়াবহ হয়েছে। শিমুলবাড়ি গ্রামের জরিনা খাতুন বলেন, ‘জমি গেছে, এখন বাড়িটাও নদী খেয়ে ফেলবে—তখন কোথায় থাকব?’
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, ধুনটের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আপাতত জিও টিউব ও বালুভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। স্থায়ী সমাধানে নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে নদীপারের মানুষের দাবি, প্রতিবছরের মতো সাময়িক নয়, স্থায়ী নদীশাসনই পারে তাদের ঘরবাড়ি, জমি ও জীবিকা রক্ষা করতে।
 

আরও পড়ুন

×