৪ কারণে বেশি বর্ষণ, ৬ বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টির শঙ্কা
রাজধানীতে ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৫৯
মৌসুমি বায়ু আরও সক্রিয় হয়ে ওঠায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। টানা এই বর্ষণের পেছনে রয়েছে উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপ, মৌসুমি বায়ুর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা, বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তিত গতিপথ এবং এল নিনোর প্রভাব। এ অবস্থায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৯ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোথাও কোথাও নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা অথবা বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
আজ সোমবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তি এবং পাউবোর নিয়মিত বন্যা পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু বর্তমানে আরও সক্রিয় হয়ে পড়েছে। এ কারণে নতুন করে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। তবে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে। এরপর বৃহস্পতিবার থেকে মৌসুমি বায়ু আবার সক্রিয় হলে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার সকাল ৬টা থেকে আজ সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় রাজধানীতে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সোমবার ঢাকায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৯৭ মিলিমিটার। চট্টগ্রাম শহরের আমবাগান এলাকায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৭৪ মিলিমিটার।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রসারিত। বর্তমানে মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজ করছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১১ দিনেই দেশে গড়ে ৩৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা পুরো জুলাই মাসের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ। সাধারণত জুলাই মাসে দেশে গড়ে ৫২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
আবহাওয়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান বলেন, উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ, মৌসুমি বায়ুর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা, বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তিত গতিপথ এবং বৈশ্বিক জলবায়ুগত প্রভাবের কারণে টানা ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ বলেন, এবার নিম্নচাপের গতিপথ স্বাভাবিকের তুলনায় ভিন্ন ছিল। ফলে জলীয়বাষ্পসমৃদ্ধ বায়ু দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের দিকে বেশি প্রবাহিত হয়েছে। এ কারণে ওই অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক এবং আবহাওয়া ডটকম ও ‘আবহাওয়াবিদ’ অ্যাপের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়ায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্প বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, ভারতের ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের রাখাইন পর্বতমালায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ওরোগ্রাফিক প্রভাবে এসব এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর চারটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সুরমা নদীর সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ২৭ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার সামান্য ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ ছাড়া নেত্রকোণার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। একই সঙ্গে সুরমা নদীর কানাইঘাট, সিলেট সদর ও সুনামগঞ্জ, তিস্তা নদীর ডালিয়া ও কাউনিয়া এবং মুহুরি নদীর হরিপুর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি অথবা বিদ্যমান পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তবে পার্বত্য অঞ্চলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস দিয়েছে সংস্থাটি। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরি নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণাধীন ১২৭টি নদী পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৮০টিতে পানি বেড়েছে, ৪৪টিতে কমেছে, দুটি স্টেশনে অপরিবর্তিত রয়েছে এবং একটি স্টেশনের তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
- বিষয় :
- বৃষ্টি
- আবহাওয়া অধিদপ্তর
- পাউবো
- মৌসুমী বায়ু