ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সমীক্ষা

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের দায়মুক্তিকে উৎসাহিত করছে

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের  দায়মুক্তিকে উৎসাহিত করছে
×

বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনা বক্তারা। গতকাল সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে -সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়ে একটি গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটির ২০২৫ সালের সমীক্ষায় ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হয়রানি, হত্যা, আত্মহত্যা, যৌতুক, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতা এবং ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তিকে উৎসাহিত করছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব ও মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার সম্পাদক রীনা আহমেদ।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান সমীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে সংরক্ষিত ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনার ভিত্তিতে এ সমীক্ষা চালানো হয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ১৪২ জন, আত্মহত্যার ঘটনায় ২০৩ জন এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় ১১৭ জন কন্যাশিশু ভুক্তভোগী হয়েছে। অন্যদিকে হত্যার ঘটনায় ৭৫৬ জন, ধর্ষণের ঘটনায় ৩৭৬ জন এবং যৌন হয়রানির ঘটনায় ১২৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ভুক্তভোগী হয়েছেন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শৈশবে যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বেশি থাকলেও বয়স বাড়ান সঙ্গে সঙ্গে হত্যা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, হত্যার ঘটনায় ভুক্তভোগীদের ৫৮ শতাংশ, আত্মহত্যার ঘটনায় ৬৩ শতাংশ এবং যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনায় ৯৪ শতাংশই গৃহিণী। অন্যদিকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় ভুক্তভোগীদের ৮০ শতাংশ, আত্মহত্যার ঘটনায় ৬৭ শতাংশ, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ৩৯ শতাংশ এবং বাল্যবিবাহের ঘটনায় ১০০ শতাংশই শিক্ষার্থী কন্যাশিশু। সমীক্ষায় আরও বলা হয়, গৃহ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান–উভয় স্থানই নারী ও কন্যাশিশুর জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে, যা তাদের নিরাপত্তা সংকটকে আরও তীব্র করছে।

সমীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতা এবং সামাজিকভাবে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তিকে উৎসাহিত করছে। নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সমীক্ষার পর্যবেক্ষণ দেশের সামনে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সহিংসতার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে নারীর কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব গৃহিণী পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নারী সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে ছয় থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুকন্যাদের ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হওয়া সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, কন্যাশিশুদের এই বয়সে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করে, ধর্ষণের জন্য কখনোই ভুক্তভোগী দায়ী নয়; দায়ী অপরাধী এবং সেই সামাজিক মানসিকতা, যা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়। একই সঙ্গে ধর্ষণের পাশাপাশি হত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অর্থাৎ নারী শুধু যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন না, তাঁর জীবনও ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। এটি কেবল নারীর সংকট নয়; বরং পুরো সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার সংকটের প্রতিফলন।

গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু ঘটনা প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং সহিংসতার সামাজিক ও কাঠামোগত কারণও তুলে ধরা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিচয়, জীবন ও পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও অপরাধী সম্পর্কে খুব কম তথ্য প্রকাশিত হয়। তাই ভুক্তভোগীর প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি অপরাধীকেও দৃশ্যমান করতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ধর্ষণ, হত্যা কিংবা এ ধরনের সহিংসতা ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু প্রায়ই এসব অপরাধের ক্ষেত্রে স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে আপস করার চেষ্টা করা হয়, যা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের অপরাধের বিচার আদালতেই হতে হবে। সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং অপরাধীদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করে।

আরও পড়ুন

×