বন রক্ষার প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে, ভাগাড়ের পর এবার বিদ্যুৎ
বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস
গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের শালবনে নির্মাণাধীন ভাগাড়। সম্প্রতি তোলা সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের শালবন ছিল একসময় জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আবাস। তবে দুই দশকের ধারাবাহিক দখল, অবকাঠামো নির্মাণ ও নগরায়ণের চাপে এখন শালবনের ত্রিশঙ্কু দশা। বনের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন-এসটিএস)। হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা দিলেও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি। বরং সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বনের ভেতর বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এতে পরিবেশবিদ, আইনবিদ ও বন কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পটভূমিতে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস। প্রকৃতিকে সুরক্ষা ও সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতেই বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এগিয়ে চলছে নির্মাণকাজ
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশেই। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বর্জ্যের স্তূপ জমে থাকত। এখন শালবনের ভেতরের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। উদ্যানের সীমানাপ্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে সেখানে প্রবেশ পথ তৈরি করা হয়েছে। সেই পথ ধরে ভেতরে গেলে দেখা যায় বিশাল অবকাঠামো। এটিই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন। এর পাশেই ঝুলছে সরকারের ‘২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’র সাইনবোর্ড। সেখানে কর্মরত এক শ্রমিক জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে। প্রায় ৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই স্থাপনায় একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার টন বর্জ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এ ব্যাপারে গত মে মাসের শুরুতে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) হাইকোর্টে রিট করে। রিট আবেদনে বলা হয়, সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে এসটিএস নির্মাণ এবং সেখানে বর্জ্য ফেলা ১৯২৭ সালের বন আইন ও ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের লঙ্ঘন। গত ৪ মে রিটটি আমলে নিয়ে উদ্যানের ভেতরে সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ছয় মাসের জন্য ভাওয়ালের আশপাশে বর্জ্য ফেলা থেকেও গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে বিরত থাকতে বলা হয়। তবে আদালতের নির্দেশের পরও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি।
বন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষিত
নথিপত্র অনুযায়ী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রকল্পটি শুরু থেকেই বন বিভাগের আপত্তির মুখে পড়ে। গত ১১ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের নিয়োগ করা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা কাজ শুরু করতে গেলে রেঞ্জ কর্মকর্তা তাদের অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চান। তারা কাগজপত্র দেখাতে না পারলেও কাজ চলতে থাকে। পরদিন রাতে এক্সক্যাভেটর দিয়ে উদ্যানের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে সেখানে রাস্তা তৈরি করা হয়। এরপর নির্মাণকাজ বন্ধ করতে গেলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে জড়ো হলে বন কর্মকর্তারা অসহায় হয়ে পড়েন। কয়েক দিন পর পরিদর্শনে গিয়ে কর্মকর্তারা বনের একটি অংশে আগুন লাগানোর ঘটনাও দেখতে পান।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির জন্য বন বিভাগ বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেয়নি সিটি করপোরেশন। ১৬ ও ২০ এপ্রিল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জানান। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, সংরক্ষিত বনের ভেতরে এ ধরনের নির্মাণকাজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তারা বারবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে তারা কাজ বন্ধে রাজি হননি।
সিটি করপোরেশনের দাবি, অবকাঠামোটি ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি জোত জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই জমি জাতীয় উদ্যানের সীমানার মধ্যে অবস্থিত। বহু বছর ধরে সরকারি নীতিমালার কারণে সেখানে শুধু কৃষিকাজের অনুমতি রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকলেও সেখানে বর্জ্য স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই।
বেলার প্রধান নির্বাহী ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জমিটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হলেও এর ব্যবহার আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য কেন্দ্র নির্মাণের আইনি ভিত্তি নেই। আইন একটি হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে কীভাবে একটি বর্জ্য স্টেশন নির্মাণের চিন্তা করা হলো, সেটিই বড় প্রশ্ন।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা খানম বলেন, উপযুক্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে না। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একাধিক এসটিএস প্রয়োজন হলেও জমি সংকটে আমরা বিকল্প পাচ্ছি না।
এবার বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমতি
সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণকাজ চলমান অবস্থায় নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একটি সিদ্ধান্ত। ১৪ জুলাই মন্ত্রণালয়ের বন অধিশাখা-১ থেকে জারি করা এক চিঠিতে শ্রীপুর পৌরসভা থেকে নির্মিত ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের জন্য বনভূমির ভেতরের প্রায় দশমিক ০৬৩ একর এলাকায় শর্তসাপেক্ষে অস্থায়ী বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। চিঠিতে সই করেন সিনিয়র সহকারী সচিব কাউছার আহাম্মেদ।
এই চিঠির পর পরিবেশবিদদের মধ্যে উদ্বেগ আরও ছড়িয়ে পড়েছে। তারা বলেন, একদিকে বনে বর্জ্য স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে; অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ ধুঁকতে থাকা প্রাণ-প্রকৃতিকে আরও বিপন্ন করবে।
‘ঢাকার ফুসফুস’ নিয়ে নতুন শঙ্কা
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, নানা রকম বর্জ্য যদি এখানে নিয়মিত জমা হতে থাকে, তাহলে পুরো বনাঞ্চলের পরিবেশ ও বায়ুর মান খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্যপ্রাণীরা এসব বর্জ্য খেয়ে অসুস্থ হবে, মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে এবং এতে পুরো বাস্তুসংস্থান স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে। পাশাপাশি গভীর নলকূপের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেলে শালবনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকাও হুমকির মুখে পড়বে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে হবে। নতুবা ভাওয়ালের মতো বনভূমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।