জুলাইয়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছয় মাসের দ্বিগুণ
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ০১:৪৩
দেশে চলতি জুলাই মাসের ৩০ দিনে ডেঙ্গুতে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সংখ্যা আগের ছয় মাসের প্রায় দ্বিগুণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদদের আশঙ্কা, আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৬৭ জন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১১৯ জন, ঢাকা বিভাগে ৭০, চট্টগ্রামে ৬৯, বরিশালে ৬৭, খুলনায় ৬৬, রাজশাহীতে ৩২, ময়মনসিংহে ২১, রংপুরে ২০ এবং সিলেটে তিনজন ভর্তি হয়েছেন।
এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১৫৭। মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের। এর মধ্যে চলতি মাসের ৩০ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৫৩ জন এবং মারা গেছেন ৩৫ জন। যা মোট আক্রান্তের ৫৯ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ডেঙ্গুতে মারা যান ১৮ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে দুজন, ফেব্রুয়ারিতে দুজন, মে মাসে একজন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। মার্চ ও এপ্রিলে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। অথচ জুলাই মাসেই মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ৩৫ জন। একইভাবে প্রথম ছয় মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ১০৪ জন, যা জুলাই মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৩ জনে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৯৩১ জন রোগী হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এক হাজার ১৬৯ জন।
আগস্ট থেকে বাড়তে পারে সংক্রমণ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর মূল মৌসুম এখন শুরু হয়েছে। যথাসময়ে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদের মতে, জুলাইয়ে সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছিল না। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সামনের মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার বলেন, গত মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি এবং পরবর্তী আবহাওয়াগত পরিস্থিতি এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। সাধারণত বড় বৃষ্টির অন্তত দুই মাস পর মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ফলে আগস্ট, সেপ্টেম্বর এমনকি অক্টোবর পর্যন্তও ডেঙ্গুর সংক্রমণ উচ্চমাত্রায় থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছর ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) আক্রান্তদের নমুনা বিশ্লেষণে এ প্রবণতা শনাক্ত করেছে।
আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ডেন-২ সেরোটাইপের আধিপত্য ছিল। এবার ডেন-৩ বেশি সক্রিয় হওয়ায় আগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি অন্য সেরোটাইপে আবার সংক্রমিত হলে রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ঢাকার বাইরে বাড়ছে ঝুঁকি
চলতি বছর ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য মিলেছে বরিশাল বিভাগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, রাজধানীর বাইরে ব্যাপকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় মৃত্যুঝুঁকিও বেড়েছে। নতুন সেরোটাইপের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ অবস্থায় মশার বংশবিস্তার রোধে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন এবং মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। আর ২০২৩ সালে দেশে সর্বোচ্চ তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত হন এবং প্রাণ হারান এক হাজার ৭০৫ জন।
- বিষয় :
- ডেঙ্গু
- মৃত্যু
- ডেঙ্গু রোগী