ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সতর্কবার্তা

এল নিনোর প্রভাবে রেকর্ড তাপমাত্রার শঙ্কা

তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে

এল নিনোর প্রভাবে রেকর্ড তাপমাত্রার শঙ্কা
×

ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটি বলছে, এটি শুধু আরেকটি জলবায়ুগত ঘটনা নয়; আগামী কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে। এর প্রভাব কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এ সতর্কবার্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ দেশের কৃষি, খাদ্যব্যবস্থা, পানিসম্পদ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশে এল নিনো মানেই খরা এমন ধারণা ভুল। বরং বঙ্গোপসাগরের উষ্ণতা, ভারত মহাসাগরের জলবায়ুগত পরিবর্তন এবং মৌসুমি বায়ুর পারস্পরিক প্রভাবে একই এল নিনো কখনও দীর্ঘ শুষ্ক সময়, আবার কখনও অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার কারণ হতে পারে।

গত শুক্রবার প্রকাশিত ডব্লিউএমওর সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে এবং বিশ্বের অধিকাংশ স্থলভাগে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করবে।

ডব্লিউএমওর মতে, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও অতিভারী বৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এল নিনো আর শুধু আমাদের দোরগোড়ায় নেই, এটি ইতোমধ্যে ঘরে ঢুকে পড়েছে এবং তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং আগেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীকে আরও উত্তপ্ত করে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গুতেরেস।

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, এল নিনোর গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হলেও শুধু আগাম সতর্কবার্তা যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সরকার ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোকে সেই সতর্কবার্তার ভিত্তিতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব সরলরৈখিক নয়। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা সাধারণভাবে এল নিনোকে দুই ভাগে ভাগ করেন- ইস্টার্ন প্যাসিফিক এল নিনো (ইপিই) এবং সেন্ট্রাল প্যাসিফিক এল নিনো (সিপিই বা মোডোকি)। ১৯৮২-৮৩, ১৯৯১-৯২ ও ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী ইস্টার্ন প্যাসিফিক এল নিনোর সময় দেশের কিছু এলাকায় খরা পরিস্থিতি দেখা দিলেও ২০১৫-১৬ ও ২০২৩-২৪ সালের সেন্ট্রাল প্যাসিফিক এল নিনোর সময় বরং তুলনামূলক বেশি বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা হয়েছে।

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরী বলেন, এবার সমুদ্রের তাপমাত্রা ইস্টার্ন প্যাসিফিক এল নিনোর মতো হলেও বায়ুমণ্ডলের প্রতিক্রিয়ায় সেন্ট্রাল প্যাসিফিক এল নিনোর বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। এ কারণেই বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হয়েছে। তার মতে, এল নিনোর সর্বোচ্চ শক্তি যদি বছরের শেষ দিকে পৌঁছায়, তাহলে চলতি মৌসুমি বৃষ্টির ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে। তাই এখনই ১৯৯৭-৯৮ সালের মতো ভয়াবহ খরার আশঙ্কা করার প্রয়োজন নেই।

ড. রাশেদ চৌধুরীর মতে, এখনই প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। পানি সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের আগাম পরামর্শ, খাদ্যশস্যের কৌশলগত মজুত এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প আমদানির পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা জরুরি। 

সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দেশের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ ও খরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবার স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিভারী বৃষ্টি হয়ে আকস্মিক বন্যাও দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য সুপার এল নিনোর সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়তে পারে কৃষি খাতে। দেশের আমন ধানের আবাদ মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি কম হলে চারা রোপণ ব্যাহত হবে। আবার দীর্ঘ তাপপ্রবাহে মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় সেচের চাহিদা ও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।

ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাজিব কুমার সাহা বলেন, দীর্ঘ শুষ্ক সময় ও নদীর প্রবাহ কমে গেলে উপকূলে লবণাক্ততা বাড়বে। এতে কৃষি উৎপাদন কমতে পারে। খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কৃষকদের রোপণের সময়, সেচ ব্যবস্থা ও বীজ নির্বাচনে পূর্বাভাসভিত্তিক পরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে। 

আরও পড়ুন

×