ঢাকা রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস

অভাব, অবহেলা, বঞ্চনার মধ্য দিয়ে কাটে জীবন

অভাব, অবহেলা, বঞ্চনার মধ্য দিয়ে কাটে জীবন
×

ফাইল ছবি

 সমকাল প্রতিবেদক ও রাঙামাটি প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪০ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৮ বছরের বেশি সময়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত ও পূর্ণাঙ্গ ভূমির অধিকার পায়নি। পাহাড়ের একাধিক সূত্র বলছে, আদিবাসীরা নিজেদের পরিচয়ের স্বীকৃতি পাননি। অভাব, অবহেলা, বঞ্চনার মধ্য দিয়ে কাটছে জীবন। একসময়ের শান্ত পাহাড় এখন অশান্ত। বিভিন্ন গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুর সামনে বাস করতে হচ্ছে তাদের। 

পার্বত্যাঞ্চলের এই পরিবেশে আজ রোববার পালন করা হবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬। জাতিসংঘের এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান : অধিকার এগিয়ে নেওয়া, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তঃপ্রজন্মের কল্যাণ প্রচার’। 

দেশের বিশেষায়িত তিন জেলা বান্দরবার, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সশস্ত্র গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সেই সময়ের আওয়ামী লীগ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দীর্ঘ ২৮ বছরে পাহাড়ে শান্তি আসেনি। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে তাদের জীবন। দীর্ঘ সময়েও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি মেলেনি। 

আবেদন নিষ্পত্তি হয়নি, পরের জমিতে বাস 
রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ঘনমোড় মৌজার শিলকাটা গ্রামের জ্ঞান লাল চাকমা ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন অফিসে তাঁর পাঁচ একর বসতভিটা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছিলেন। বর্তমানে ওই জমিতে পুনর্বাসন করা লোকজন বসবাস করছেন। বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় জ্ঞান লালকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার দেবাছড়ি গ্রামে অন্যের ভূমিতে বসবাস করতে হচ্ছে। 

জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবন 
কৃষক ন্যালশন চাকমা পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার পাবলাখালি থেকে পার্শ্ববর্তী দেশে শরণার্থীর জীবন কাটিয়ে সম্প্রতি নিজ ভূমে ফিরে আসেন। তবে নিজের জমিজমা ফেরত পাননি। তিনি বর্তমানে একই উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট এলাকায় পরিবার নিয়ে উদ্বাস্তুর মতো জীবন কাটাচ্ছেন। জ্ঞান লাল ও ন্যালশনের মতো আরও অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করছেন। 

আদিবাসী ফোরামের কর্মসূচি 
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আজ রোববার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে র‌্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য জগদীশ চন্দ্র বর্মণ। 

অতিথি হিসেবে থাকবেন মানবাধিকার কর্মী ও নারী অধিকার কর্মী খুশী কবির, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য (নাটোর-নওগাঁ) আন্না মিনজ, সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি উষাতন তালুকদার, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা প্রমুখ।  
এ ছাড়া খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান– তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসীরা দিবসটি পালন উপলক্ষে শোভাযাত্রা ও সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন করেছেন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় দিবসটি পালন করা হবে। 

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যকারিতা নেই 
জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমিস্বত্ব নিশ্চিত করে ভূমি অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। এ লক্ষ্যে ভূমি সমস্যা সমাধানে ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করে সরকার। পরে ২০০১ সালে এ কমিশনের আইনটি সংশোধনী আকারে জাতীয় সংসদে পাস হলে কমিশন পুনর্গঠিত হয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে চেয়ারম্যান করে ৯ সদস্যর সমন্বয়ে কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তবে পার্বত্য চুক্তির কিছু ধারা সাংঘর্ষিক হওয়ায় আইন সংশোধনে দীর্ঘ ১৬ বছর লেগে যায় কমিশনের। পরে ২০১৬ সালে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন জাতীয় সংসদে সংশোধনী আকারে পাস হয়। এ কমিশনে তিন বছর মেয়াদে ইতোমধ্যে পাঁচজন চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়েছেন। এ কমিশনে যষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মুহাম্মদ আব্দুল হাফিজ। 

ভারতফেরত শরণার্থীদের ভূমি ফিরে পাননি 
পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারত থেকে ফিরে আসা উপজাতীয় শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের চিহ্নিত ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুবিষয়ক টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটিতে ইতোমধ্যে পাঁচজন চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়েছেন। সর্বশেষ ষষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় সুদত্ত চাকমা চলতি বছরে ১০ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করায় বর্তমানে পদটি শূন্য রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে ৮০ হাজারের অধিক পরিবার তালিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ভারত প্রত্যাগত প্রায় ৩৭ হাজার পরিবারকে ২০ দফা প্যাকেজের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারা নিয়মিত রেশন পেলেও অনেকেই নিজেদের ভিটেমাটি ফেরত পাননি।

টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, বর্তমানে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদটি খালি। এর আগে কমিটির ২৮টি বৈঠক হয়েছিল। তবে কোনো সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্ষন্ত  একপক্ষীয়ভাবে পাহাড়িদের ওপর হামলা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ ২৯টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার কারণে জানমালের নিরাপত্তাহীনতার অভাব ছাড়াও উপরন্তু উদ্বাস্তু হওয়া লোকজন তাদের নিজদের জমি ফেরত পাননি। 

আরও পড়ুন

×