বছরে দুবার শুনানির কথা
ঔষধ প্রশাসনের ভোক্তাবিহীন গণশুনানিও বন্ধ আড়াই বছর
ছবি: ফাইল
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪০ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৯
ওষুধের নিবন্ধন, মূল্য নির্ধারণ ও মানসংক্রান্ত বিষয়ে বছরে অন্তত দুবার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের গণশুনানি হওয়ার কথা। কিন্তু গত আড়াই বছরে এমন কোনো শুনানি হয়নি। এর আগে আয়োজিত গণশুনানিগুলোতেও সাধারণ ভোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না।
ফলে ওষুধের দাম, মান, প্রাপ্যতা, নিবন্ধনসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা সমস্যা ও অভিযোগ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কাছে সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে ওষুধ খাতের প্রকৃত ভোক্তা-অভিজ্ঞতা ও জনসাধারণের প্রত্যাশার একটি বড় অংশ প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি দপ্তরের সেবার মান উন্নয়ন, নাগরিক সনদ বাস্তবায়ন এবং সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ সরাসরি শুনে নিষ্পত্তির অন্যতম মাধ্যম হলো গণশুনানি। বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০০৪-এ সামাজিক জবাবদিহি কাঠামো অনুযায়ী গণশুনানি নাগরিক ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি জবাবদিহির কার্যকর পদ্ধতি। এ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ সরাসরি প্রশ্ন করতে পারে। কর্তৃপক্ষকে সাধারণ ভোক্তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি প্রতিষ্ঠানে বছরে অন্তত দুবার গণশুনানি আয়োজনের কথা।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সর্বশেষ গণশুনানি হয় ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মহাখালীর অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা ওষুধের নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং উৎপাদন লাইসেন্স নবায়ন ছিল ওই গণশুনানির মূল বিষয়। সভাপতিত্ব করেন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ। তবে সেখানে ওষুধের প্রকৃত ভোক্তা সাধারণ নাগরিকদের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। অংশ নেন মূলত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
সেই গণশুনানিতে ওষুধের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, উৎপাদন লাইসেন্স নবায়নে সেবার গতি বাড়ানো, বায়োসিমিলার ওষুধ নিবন্ধনে সহযোগিতা বৃদ্ধি, আবেদন পাওয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে আবেদনকারীকে দ্রুত লিখিতভাবে জানানোসহ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মহাপরিচালক বলেছিলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। সেবা আরও উন্নত করতে অংশীজনদের মতামত নেওয়ার জন্য এই আয়োজন করা হয়েছে। যদিও ওই গণশুনানিতে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল না।
ওষুধের দাম বাড়লেও কারণ জানেন না ভোক্তারা
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা প্রায় আট বছর ধরে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন করেন। প্রতি মাসে ওষুধ কিনতেই তাঁর খরচ হয় প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস পরপরই দেখি কোনো না কোনো ওষুধের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু কেন বাড়ল, সেটা কেউ আমাদের জানায় না। আমরা শুধু ফার্মেসিতে গিয়ে বেশি টাকা দিয়ে কিনে আসি। যারা নিয়মিত ওষুধ খায়, তাদের জন্য কয়েক টাকা বাড়লেও মাস শেষে সেটা বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।’ এই ভোক্তার প্রশ্ন, ওষুধের দাম নির্ধারণ নিয়ে যদি গণশুনানি হয়, সেখানে রোগী বা সাধারণ মানুষের কথা শোনার সুযোগ কেন থাকবে না?
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল সমকালকে বলেন, গণশুনানির মূল উদ্দেশ্যই হলো সেবাগ্রহীতার কণ্ঠস্বর সরাসরি নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যদি সেখানে শুধু সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা থাকেন, আর সাধারণ ভোক্তারা অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থে গণশুনানি থাকে না।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) আশরাফ হোসেন সমকালকে বলেন, গত আড়াই বছরে গণশুনানি হয়নি। তবে এর আগে যেসব গণশুনানি হয়েছে, সেখানেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। অথচ ওষুধের সবচেয়ে বড় অংশীজন হলো সাধারণ ভোক্তা।
বর্তমান পরিচালক ড. আকতার হোসেন বলেন, গণশুনানিতে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। বিষয়টি আগে সেইভাবে বিবেচনায় আসেনি। ভবিষ্যতে গণশুনানিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুই বছরে গণশুনানি নিয়মিত না হওয়ার পেছনে নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতা কাজ করেছে। ‘ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’-এর ৩০ ধারা অনুযায়ী ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে সাম্প্রতিক কিছু নীতিমালা পরিবর্তনের পর মূল্য নির্ধারণ–সংক্রান্ত কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ওষুধের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদানকারী ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটির (ডিসিসি) সভাও প্রায় দুই বছর ধরে হয়নি। ওষুধের মূল্য নির্ধারণ কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন হয়নি। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর