ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাজীপুর সাফারি পার্ক

দুই দিনে ২ হাতির মৃত্যু, নানা প্রশ্ন

দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসায়ও বাঁচানো গেল না

দুই দিনে ২ হাতির মৃত্যু, নানা প্রশ্ন
×

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৩ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১২:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুর সাফারি পার্কে দুই দিনে দুটি হাতির মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ আগস্ট মারা গেছে প্রায় আড়াই মাস ধরে চিকিৎসাধীন মালিকানাধীন হাতি রাজু বাহাদুর। আগের দিন ৬ আগস্ট মারা যায় একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি।

রাজু বাহাদুরকে বাঁচাতে দেশি চিকিৎসকদের পাশাপাশি থাইল্যান্ডের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার চিকিৎসকদের সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়। মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চলেছিল চিকিৎসা। এত উদ্যোগের পরও হাতিটি বাঁচানো যায়নি।

পরপর দুটি হাতি মারা যাওয়ায় পার্কে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা, আবাসন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানি ও সাঁতার কাটার সুযোগ, মাহুতের সংখ্যাসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রাণী কল্যাণকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলা হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ মে পার্কের হাতিশালায় শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় রাজু বাহাদুরের ওপর হামলা করে চার বছর বয়সী হাতি জয়িতা। রাজু বাহাদুর মাটিতে পড়ে গুরুতর আহত হয়। একটি পা ভেঙে যায়, অন্য একটি পায়েও গুরুতর আঘাত লাগে। তার পর সেটি আর স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারেনি। ক্রেনের সাহায্যে সরিয়ে বালুর ওপর রাখা হয়। শুয়ে থাকা অবস্থাতেই আখসহ বিভিন্ন খাবার দেওয়া হচ্ছিল।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, একটি পা ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি অন্য পায়েও গুরুতর আঘাত রয়েছে। পরিস্থিতি সংকটজনক হওয়ায় ৪ জুন থাইল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞ বন্যপ্রাণী চিকিৎসকদের আনা হয়। দেশি চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত একাধিক মেডিকেল বোর্ডও চিকিৎসা তদারক করে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, আঘাতের পর রাজু বাহাদুর সীমিত খাবার গ্রহণ করছিল। ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। ৭ আগস্ট সকালে হাতিশালায় এটিকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান কর্মীরা। সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, হাতিদের মধ্যে কখনও কখনও সংঘর্ষ ঘটে। তেমন একটি ঘটনায় রাজু বাহাদুর গুরুতর আহত হয়েছিল। 

রাজু বাহাদুরের মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন অংশের নমুনা ও ভিসেরা সংগ্রহ করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। এর আগের দিন মারা যাওয়া হাতিটিও ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিল বলে জানিয়েছে পার্ক কর্তৃপক্ষ। সেটির দেহের নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। দুটি হাতির দেহই ময়নাতদন্ত ও নমুনা সংগ্রহের পর পার্কের ভেতরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে গাজীপুর সাফারি পার্কে হাতি আছে আটটি।

গাজীপুর বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের মো. আতিকুর রহমান নামে এক ব্যক্তির মালিকানায় ছিল রাজু বাহাদুর। বিভিন্ন সড়ক ও বাজারে মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তোলায় এটিকে ব্যবহার করা হতো। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট হাতিটি উদ্ধার করে গাজীপুর সাফারি পার্কে নিয়ে আসে। উদ্ধারের সময় সেটির বয়স ছিল প্রায় ৯ বছর বলে জানা যায়। সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের হিসাবে হামলার সময় বয়স ছিল ১০ বছর। উদ্ধার করা হাতিকে সাফারি পার্কে এনে কী ধরনের পরিবেশে রাখা হয়েছিল; সেটির কল্যাণ নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং সেই ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর ছিল; এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।

প্রাণী কল্যাণ সংস্থা পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রাকিবুল হক এমিল বলেন, সাফারি পার্কে শিকলবন্দি হাতিগুলোর জন্য দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পানিপানের ব্যবস্থা ছিল না। হাতি দীর্ঘ সময় শিকল দিয়ে একই জায়গায় বেঁধে রাখলে স্বাভাবিক আচরণ ব্যাহত হয়। সাফারি পার্কে হাতির জন্য পর্যাপ্ত মাহুতও নেই। পার্কে গরমের সময় হাতির পানিতে নামানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। 

গাজীপুর সাফারি পার্কে প্রাণীর মৃত্যু নতুন ঘটনা নয়। গত বছর ১৬ জানুয়ারি পার্কের দেয়াল টপকে একটি নীলগাই পালিয়ে যায়। এর আগে ২০২১ সালেও একটি নীলগাই পালিয়ে গিয়েছিল। ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর পার্কে একটি সিংহ ও একটি ওয়াইল্ডবিস্ট মারা যায়। ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহ মারা যায়। ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর একটি জিরাফের মৃত্যু হয়। 

প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, সাফারি পার্কে প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ, চলাফেরা, খাবার, পানি, চিকিৎসা, সামাজিক আচরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকার কথা। বিশেষ করে হাতির মতো বৃহৎ ও সামাজিক প্রাণীর ক্ষেত্রে জায়গার পরিমাণ, জলাধার, কাদায় গড়াগড়ি, ছায়া, চলাচলের সুযোগ এবং দলগত আচরণের বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজু বাহাদুরের মৃত্যুতে বাংলাদেশে বন্দি হাতি ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
 

আরও পড়ুন

×