ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণাও বাড়ছে

পটুয়াখালীতে দিনে-রাতে ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই

লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণাও বাড়ছে
×

প্রতীকী ছবি

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৪২ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাস সংকটে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এর মধ্যে বেড়েছে গরম। ফলে দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে মানুষের মধ্যে। এরই মধ্যে এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ না পেয়ে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে পিডিবির কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন কয়েকশ বাসিন্দা। এ সময় এক প্রকৌশলী আহত হয়েছেন। পটুয়াখালীতে দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চিকিৎসাসেবা। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে দিনে ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। মৌলভীবাজারে লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে চা উৎপাদন।

পিজিসিবির হিসাবে, বুধবার রাত ৯টায় দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৬৬ মেগাওয়াট। রাতে আর সকালের দিকে ঘাটতি কিছুটা কমলেও গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আবার বাড়ে। বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৭৭৪ মেগাওয়াট। রাত ৮টায় তা হয় ১ হাজার ৫৯৮ মেগাওয়াট। তবে বিতরণ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে বাস্তবে লোডশেডিং আরও বেশি। 

রাজধানীর সেগুনবাগিচার বাসিন্দা নাসরিন সুলতানা বলেন, গরমের মধ্যে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গতকাল দুপুর ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। বাসায় শিশু ও বয়স্ক মানুষ থাকায় দুর্ভোগ বেড়েছে। কখন বিদ্যুৎ যায়, কখন আসে তার ঠিক নেই।

মগবাজারের বাসিন্দা নাসিমা বেগম বলেন, বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ গেলে গরমে কষ্ট হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে পরিস্থিতি খারাপ যাচ্ছে। 

পটুয়াখালীতে ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই
পটুয়াখালীতে পরিস্থিতি বেশ খারাপ। জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে হাসপাতাল, হোটেল-রেস্তোরাঁর কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির হিসাবে, জেলার দুটি গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ১০৬ মেগাওয়াট। সরবরাহ হচ্ছে ৫৭ মেগাওয়াট। পায়রা গ্রিডে ৪৪ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ২৩ মেগাওয়াট। আর পটুয়াখালী গ্রিডে ৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৩৪ মেগাওয়াট।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ খোকন মিয়া বলেন, বিশেষ করে সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ গেলে বেচাকেনা কমে যায়। এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এলেও কিছুক্ষণ পর আবার চলে যায়। আরেক ব্যবসায়ী জায়নাল আবেদীন জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানে মোমবাতি জ্বালিয়ে বসতে হয়। এতে প্রতিদিন বাড়তি খরচ হচ্ছে।

হাসপাতালগুলোতেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। শহরের একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপক অলিউর রহমান বলেন, অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে খরচ বাড়ার পাশাপাশি রোগীদেরও ভোগান্তি হয়।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে দিনে ১০-১২ বার বিদ্যুৎ যায়
গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। বিমানবন্দর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দিনে ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।

বিমানবন্দরে পিডিবির দুটি জরুরি সংযোগ রয়েছে। এর পরও জাতীয় গ্রিডে ঘাটতির কারণে লোডশেডিং ঠেকানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর জেনারেটর চালু হতে ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড সময় লাগে। ফলে ওই সময় বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশ অন্ধকার হয়ে যায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিতে আলাদা ব্যাকআপ থাকায় বিমান ওঠানামায় বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে না।

চা উৎপাদনেও ধাক্কা
মৌলভীবাজারে লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চা উৎপাদনে। জেলার ৯৩টি চা বাগানে এখন উৎপাদনের ভরা মৌসুম। কিন্তু দিনে প্রায় ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানা সচল রাখতে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।

বাগান-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বিদ্যুৎ সংকটে প্রতিটি বাগানে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ লাখ টাকা বাড়তি ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ট্রাফ হাউসে থাকা কাঁচা চা পাতা সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করা যাচ্ছে না। এতে বিপুল পরিমাণ পাতা নষ্ট হচ্ছে।
কমলগঞ্জের পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিক রামগোপাল গৌড় বলেন, প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। কারখানা চালু রাখতে ১০০ থেকে ২০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।

পিডিবি অফিসে হামলা
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষুব্ধ হয়ে পিডিবির কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন শতাধিক বাসিন্দা। গতকাল সকালে শিমরাইল গ্রামের প্রায় ২৫০ বাসিন্দা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে অফিসের কাচ ও সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়। এ সময় উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম আহত হন।

স্থানীয়রা জানান, ১৩ আগস্ট রাতে ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার পর থেকেই বিদ্যুৎ নেই। এতে পানির সংকট, খাবার সংরক্ষণে সমস্যা এবং প্রচণ্ড গরমে শিশু-বয়স্কদের দুর্ভোগ বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে যান্ত্রিক ত্রুটি ও ট্রান্সফরমার সংকটে কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে। তবে মূল চাপ তৈরি হয়েছে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায়। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংকট দ্রুত কাটবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

আরও পড়ুন

×