সংলাপে বিশেষজ্ঞরা
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম রোগীর নাগালে রাখা উচিত
ছবি- সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৪:২১
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম রোগীর নাগালের মধ্যে রাখা উচিত। এজন্য শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণ নয়, উৎপাদন ব্যয়, ন্যায্য মুনাফা, বাজারে প্রতিযোগিতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব কথা বলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধি ও আইনবিদরা। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা দুই বছর পর পর পর্যালোচনা ও হালনাগাদের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘রোগীর নাগালে ওষুধ, উৎপাদকের টেকসইতা: ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এসব পরামর্শ এসেছে। পাবলিক ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর এভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট) আয়োজিত সংলাপে অংশ নেন জনস্বাস্থ্যবিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সংসদ সদস্য, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, ওষুধশিল্পের প্রতিনিধি, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
তারা বলেছেন, সরকার গত ৩ আগস্ট অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের পুরো তালিকা বাতিল করেছে। এটি সমাধান হতে পারে না। ওষুধের কোনো তালিকায় ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। পুরো তালিকা বাতিল না করে বৈজ্ঞানিক তথ্য, রোগের ধরন ও চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিতভাবে তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই বছর পরপর ওষুধের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে ব্যবহৃত মার্ক-আপ কাঠামো মূলত ১৯৮২ সালের প্রেক্ষাপটে তৈরি। এরপর জ্বালানি, শ্রম, গবেষণা, প্যাকেজিং, পরিবহন ও আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই পুরোনো কাঠামোয় দীর্ঘদিন ওষুধের দাম অপরিবর্তিত রাখলে উৎপাদন টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। রোগী ও উৎপাদক উভয়পক্ষের স্বার্থরক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতি তৈরি করা জরুরি।
ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটিতে ১৯৯৭ সাল থেকে জাতীয় ওষুধ মূল্য নির্ধারণ কর্তৃপক্ষ (এনপিপিএ) স্বাধীনভাবে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ ও নিয়মিত সমন্বয় করছে। বাংলাদেশেও ওষুধ প্রশাসনের বাইরে স্বাধীন মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ও মিশন প্রধান ডা. মামুনুর রহমান মালিক বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা কোনো স্থির দলিল নয়। নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য, রোগের ধরন ও চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ সালে ২৪তম এসেনশিয়াল মেডিসিন তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫২৩টি এবং শিশুদের জন্য ৩৪২টি ওষুধ রয়েছে। এটি বছরে দুইবার সমন্বয় করার কথা ছিল কিন্তু করা হচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ২০২৩ সালের ওষুধ ও কসমেটিকস আইনে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতি দুই বছর অন্তর এসেনশিয়াল ওষুধের তালিকা পর্যালোচনার বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের তালিকা প্রণয়নে উপদেষ্টা পরিষদের পরিবর্তে টাস্কফোর্স ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছে। কোনো তালিকায় ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রেনাটা পিএলসির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবির বলেন, ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ওষুধের ক্ষেত্রে নির্বিচারে দাম কমানোর সিদ্ধান্ত স্থানীয় উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কোম্পানিগুলো বিদেশি কোম্পানির তুলনায় অনেক কম দামে একই ধরনের ওষুধ সরবরাহ করছে।
জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, সরকারের দায়িত্ব ওষুধের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী দাম নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ওষুধ প্রশাসনকে আরও পেশাদার ও শক্তিশালী হতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ বলেন, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ওষুধ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। ২০৩০ সালের পর মেধাস্বত্বের কারণে দেশে ওষুধের খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ওষুধের দাম কমাতে গিয়ে দেশের উৎপাদন ব্যাহত হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। দেশের ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ হচ্ছে। মাসে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ওষুধ ব্যবহার হলেও মাথাপিছু খরচ ২০০ টাকার কম। তাই দাম কমানোর সিদ্ধান্তের আগে এর বাস্তব প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) এর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন বলেন, মানুষের নাগালে ওষুধ নিশ্চিত করতে দাম, মান ও ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ওষুধনীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনৈতিক বিপণনও বন্ধ করতে হবে।