জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধ
ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে অঝোরে কাঁদলেন মা
শহীদ ইমন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৪৪
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ২৩ জনকে হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন ভুক্তভোগী শহীদ ইমনের মা কুলসুম বেগম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে বুধবার পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে ভুক্তভোগীর মায়ের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। সেদিনের লোমহর্ষক ঘটনা ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে বর্ণনা দেন তিনি।
সাক্ষ্যে ইমনের মা কুলসুম বেগম জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যায় রিকশাচালক ইমন (১৪)। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাকে উত্তর বাড্ডার তেঁতুলতলায় দেখতে পান।
তিনি আরও বলেন, পরদিন ইমনকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করি। কিন্তু শহীদ ইয়ামিনের একটি ভিডিও দেখিয়ে ইমন বলে, ‘দেখছো, আমার বয়সী ছেলেদের কীভাবে মেরে ফেলছে। আমি কেন আন্দোলনে যাব না?’ ২০ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে বাসা থেকে বের হয় ইমন। সঙ্গে তার বন্ধু নাঈম ও শাহীন গিয়েছিল। তারা তেঁতুলতলার মোড়ে আন্দোলনে অংশ নেয়। বিকেল সাড়ে ৪টায় বাসায় এসে আমার বড় ছেলে রাজীবকে শাহীন বলে, ‘ইমন গুলি খেয়েছে।’ আমি, আমার স্বামী ও রাজীব এম জেড হাসপাতালের সামনে তেঁতুলতলার মোড়ে যাই।
জবানবন্দিতে সাক্ষী উল্লেখ করেন, তেঁতুলতলা মোড়ে গিয়ে ইমনকে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন তারা। তখন তার জ্ঞান ছিল না। তাকে রিকশায় করে বাসার সামনে রাস্তায় নিয়ে আসে তার বন্ধুরা।
ইমনের মা বলেন, আমার জ্ঞান ফিরলে নিজের বাসার সামনে ছেলের মরদেহ দেখতে পাই। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেখি, মাথার পেছনে খুলিতে ছিল গুলির একটি চিহ্ন। বাঁ গালের চামড়া ঝুলে গেছে। বুকের একপাশে গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। তখন লম্বা চুলওয়ালা আওয়ামী লীগের এক নেতা এসে ধমক দিয়ে বলেন, ‘লাশ পেয়েছেন; কাঁদতে পারবেন না। না হলে লাশ গায়েব করে দেব।’ এলাকার একটি মসজিদে খাটিয়ার জন্য গেলেও আমার বড় ছেলে রাজীবকে সেটি দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, পরে অন্য একটি মসজিদ থেকে খাটিয়াসহ গোসল করানোর লোক নিয়ে আসা হয়। এরপর ইমনের জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ছেলের মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি ভোলার উদ্দেশে রওনা দিই। তখনও চারদিক থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছিল। মরদেহ নিয়ে গ্রামে যাওয়ার পথে তিন জায়গায় আওয়ামী লীগের ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন বাধা দেন। পরে অনুরোধ করে পরে ছাড়া পাই। পরদিন সকালে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে আমার ছেলের মরদেহ দাফন করা হয়।
এ সময় ছেলের হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন, কামরুল ইসলামদের দায়ী করে ট্রাইব্যুনালে অঝোরে কাঁদতে থাকেন ইমনের মা। পাশাপাশি তিনি ছেলের হত্যার বিচার দাবি করেন।