ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আমদানিতে ৪১২ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয় বাংলাদেশের

আমদানিতে ৪১২ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয় বাংলাদেশের
×
×

ছবি- এআই দিয়ে তৈরি

মেসবাহুল হক, ব্যাংকক থেকে

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৭ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও সার আমদানিতে গত সাত মাসে ৪১২ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয় হয়েছে বাংলাদেশের। এই ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইউরোপের বৃহৎ তিন অর্থনীতি জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সহযোগিতা চেয়েছে। শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলমান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের সাইডলাইনে দেশ তিনটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। 

এ বিষয়ে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সমকালকে বলেন, ‘ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের এই বাড়তি ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য এটি বড় চাপ। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের সাইডলাইনে শুক্রবার জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে আমদানির এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে তিন দেশের সহায়তা চেয়েছি আমরা।’ 

এদিকে চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আইএমএফের কাছে চাওয়া ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে আগামী সপ্তাহের শুরুতে ঢাকা আসবে সংস্থাটির স্টাফ মিশন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুক্রবার আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে শর্তগুলোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাবে দুই পক্ষ।

প্রসঙ্গত, ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাবে মার্চ থেকে ছয় মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে জ্বালানি পরিবহনের ভাড়া ব্যারেলপ্রতি ৩-৪ ডলার থেকে বেড়ে ১৫-১৭ ডলারে পৌঁছেছে।

জ্বালানির পাশাপাশি সারের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রতি টন প্রায় ৪২২ ডলার থেকে বেড়ে ৮৫০ ডলারে উঠেছিল। এতে সার আমদানির ব্যয় ও কৃষি খাতে সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে আগেই জানিয়েছিল সরকার। এর ফলে বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অনেকের আশঙ্কা ‍জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ জ্বালানির ব্যয় বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়ে। অন্যদিকে সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা খাদ্যপণ্যের দামের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

কর্মসংস্থানের বড় ঘাটতির আশঙ্কা

এদিকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেছেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন প্রায় ১২০ কোটি তরুণ। অথচ এ সময়ে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের চাহিদা ও সম্ভাব্য সুযোগের মধ্যে প্রায় ৮০ কোটি ব্যবধান তৈরি হতে পারে। আগামী প্রজন্মের জন্য এটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার মূল অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের বড় এই ঘাটতির অর্থ হতে পারে একজন তরুণীর ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরি নেই। আবার একজন তরুণের পেশাগত দক্ষতা আছে, কিন্তু কাজের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নেই। এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রজন্ম প্রশ্ন করবে, তাদের জন্য আদৌ কোনো সুযোগ আছে কিনা।

উন্নয়নের বিষয়ে আগামী ৫০ বছরের একটি সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরে বাঙ্গা বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাঁর মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি তাই শুধু কোনো একটি দেশের উন্নয়নের বিষয় নয়; বরং এটি বিশ্বের সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বলেন, চাকরি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি মর্যাদার বিষয়। কর্মসংস্থান একজন তরুণকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো না গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব কোনো একটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। একইভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলে এর সুফলও বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে, ভারী হচ্ছে ঋণের বোঝা। একই সঙ্গে জ্বালানি ও সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যার কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন ঘটছে। ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত পদ্ধতিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।

উন্নয়ন অর্থায়নের পরিধি বাড়াতে ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক যৌথভাবে নতুন একটি কাঠামো তৈরির কাজ করছে বলে জানান বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ প্রকল্প মূল্যায়ন, নথিভুক্তকরণ, বিনিয়োগের উপযোগী করে সাজানো এবং এক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অন্য বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তরের জন্য অভিন্ন পদ্ধতি তৈরি করা।

অজয় বাঙ্গা বলেন, গত প্রজন্মের উন্নয়ন কাঠামো হুবহু অনুসরণ না করে আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আরও পড়ুন

×