ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

শোকের মাঝেও ঋণের চাপ দিশেহারা পরিবার

শোকের মাঝেও ঋণের চাপ দিশেহারা পরিবার
×
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে এনজিওর ঋণ কিংবা জমি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরব। সেখানে ভালো রোজগার করে ঋণ শোধ করবেন, সদস্যদের মুখে হাসি ফুটবে–এই আশায় ছিল পরিবারও। কিন্তু কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে সেই স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়েছে। 

৯ আগস্ট রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহী জেলার ১৬ জন। তাদের মধ্যে নওগাঁর ১২ জন, নাটোরের তিনজন এবং রাজশাহীর ছিলেন একজন। ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় ৯ জনের মরদেহ দেশে পাঠানো হয়। বাকি সাতজনের মরদেহ আসছে আজ। তাদের মধ্যে নওগাঁর পাঁচজন ও নাটোরের দুজন। 
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৬ ফ্লাইটে সকাল ৮টা ৫ মিনিটে মরদেহগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বি স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এদিকে স্বজনের মরদেহের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর অপেক্ষা শেষ হচ্ছে আজ। তবে প্রিয়জনের নিথর দেহ ফেরার আগেই তাদের কাঁধে চেপেছে ঋণের বোঝা। একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে পাওনাদারদের তাগাদা–দুই চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো।

নওগাঁর পাঁচজন
নওগাঁর যে পাঁচজনের মরদেহ আসছে তাঁরা হলেন পৌর এলাকার পার-নওগাঁর শাহিন এবং আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

শেষ হচ্ছে স্বজনদের অপেক্ষা
নিহত মাসিদুল সরদার সজিবের বাড়ি আত্রাই উপজেলার মাধবপুর গ্রামে। ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন সত্তরোর্ধ্ব বাবা মজনু সরদার ও মা ছাইদা বেগম। ছেলের মুখটি শেষবারের মতো দেখতে প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। ছেলের মরদেহ দেশে ফেরানোর আকুতি জানিয়ে তাদের চোখের পানি ফেলতে হয়েছে বারবার। মজনু সরদারের একটাই চাওয়া ছিল, মৃত্যুর আগে ছেলের মুখটি শেষবারের মতো দেখা।
অন্যদিকে একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিকের মা পারুল আক্তারও ছেলের অপেক্ষায় দিন কাটিয়েছেন। ফোনে ছেলের ছবি দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন পর সন্তানকে ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও সেই ফেরা যে আর জীবিত অবস্থায় নয়, তা মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।

ভিটেমাটি বন্ধক, ঋণের বোঝা
প্রবাসীদের মরদেহ দেশে ফেরার খবরে স্বজনদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দুশ্চিন্তা কাটছে না আর্থিক সংকট নিয়ে। পরিবারের সচ্ছলতার আশায় ঋণ করে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল তাদের। কিন্তু উপার্জন শুরুর আগেই মৃত্যু কেড়ে নিয়েছে পরিবারের একমাত্র স্বপ্ন। এখন বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যও নেই অনেক পরিবারের।
আত্রাইয়ের সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। একমাত্র সম্বল ভিটাবাড়িটিও বন্ধক রাখা হয়েছে মহাজনের কাছে। এর মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। দুটি অবুঝ সন্তান নিয়ে এখন কীভাবে সংসার চালাবেন, তা বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। এর মধ্যে পাওনাদারদের তাগাদা তাঁকে আরও অসহায় করে তুলেছে।
আত্রাই ইউএনও মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। 

নাটোরের দুজন
নাটোরের যে দুজনের মরদেহ আসছে তারা হলেন নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীপাড়া গ্রামের জাকের আলীর ছেলে শামীম হোসেন (৩৪) এবং খাজুর গ্রামের শ্রীপুরপাড়ার গোলাম রাব্বানির ছেলে সাব্বির হোসেন (২৭)। শামীমের বাবা জাকির হোসেন ও সাদ্দামের বাবা গোলাম রাব্বানি বলেন, ছেলের মুখ দেখার জন্য প্রতীক্ষায় রয়েছি। মরদেহ বাড়িতে আসার পরে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হবে। 
খাজুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান সোহরাব হোসেন বলেন, অতি সাধারণ কৃষক পরিবারের এসব সন্তানরা ধারদেনা করে বিদেশ যান। ব্যাংক এবং এনজিওতে ঋণ রয়েছে। সরকারের কাছে তিনি এসব ঋণ মওকুপ করার দাবি জানান।
(তথ্য দিয়েছেন নওগাঁ প্রতিনিধি ও নাটোর সংবাদদাতা)

আরও পড়ুন

×