বিহঙ্গ কথা
সোনাদিয়ার দুর্লভ পীত পাথুরে বাটান
সোনাদিয়ার কালাদিয়া চরে পীত পাথুরে বাটান- লেখক
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২১ | ১৩:২৫
মহাবিপন্ন চামচঠোঁটি চাপাখির খোঁজে গত বছর কক্সবাজারের সোনাদিয়ার কালাদিয়া চরে গিয়ে আরেকটি দুর্লভ সৈকত পাখিকেও খুঁজছিলাম। কিন্তু মহাবিপন্ন পাখিটির সন্ধান পেলেও দুর্লভ পাখিটির দেখা পেলাম না। গত ১০-১২ বছর ধরে পাখিটিকে খুঁজছি সুন্দরবন, নিঝুমদ্বীপ, দমারচর ও সেন্টমার্টিন দ্বীপপুঞ্জে। ফলাফল শূন্য। কাজেই ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ওদের খোঁজে আবারও কক্সবাজারের বাসে চাপলাম। পথে সৃষ্ট সড়ক দুর্ঘটনার কারণে কক্সবাজার পৌঁছতে বেশ দেরি হয়ে যায়। সোনাদিয়া আর যাওয়া হলো না। পরদিন সকালে স্পিডবোটে চাপলাম, কিন্তু ভাটা ধরতে দেরি হওয়ায় জোয়ারের পানি দ্রুত বাড়তে থাকল। ফলে সকালটাও নষ্ট হলো। এরপর দুপুর ১২টায় আবার ভাটা এলো। বেলা দেড়টায় কালাদিয়ার সামনের অংশটি জেগে উঠতেই স্পিডবোট থেকে নেমে চরে হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম। দশ মিনিট পর কিছুটা দূরের আরেকটি চরে একঝাঁক বড় জিরিয়া নামল। ওদের ছবি তুলতে তুলতে সামনে এগোতে থাকলাম। আরও কিছু পাখি এসে প্রথম দলটির সঙ্গে যোগ দিল। দুপুর ঠিক ২টা ৫ মিনিটে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে গাঢ় রঙের একটি পাখিকে চরে নামতে দেখেই মনটা খুশিতে ভরে উঠল। এক মিনিটেরও কম সময়ে আরেকটি পাখি এলো। ওদের ছবি তুলতে তুলতে একসময় কোমড় পানিতে নেমে গেলাম। বেশকিছু ছবি তুলে দ্রুত চরের বালুময় অংশে ফেরত এলাম।
এতক্ষণ যে দুর্লভ পাখির কথা বললাম সে এ দেশের পরিযায়ী সৈকত পাখি পীত পাথুরে বাটান বা পাথরঘুরানি বাটান। ইংরেজি নাম Ruddy Turnstone বা Turnstone। বৈজ্ঞানিক নাম Arenaria interpres। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ায় পাখিটির বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
পীত পাথুরে বাটান ছোট আকার ও গাট্টাগোট্টা ধরনের সৈকত পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য ২২-২৪ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৫০-৫৭ সেন্টিমিটার ও ওজন ৮৫-১৫০ গ্রাম। প্রজননকালীন ও অন্য সময় প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পালকের রঙে বেশ পার্থক্য থাকে। দেহের ওপরটা কালচে-বাদামি।
নিচের অংশ, থুতনি ও গলার ওপরটা সাদা। বুকে থাকে প্রশস্ত কালচে-বাদামি পট্টি। প্রজননকালে মাথা হয় সাদা এবং দেহের ওপরটা হয় তামাটে-লাল। ঘাড় ও বুকে সাদা-কালোর কারুকাজ দেখা যায়। ডানা ও কাঁধ-ঢাকনিতে সাদা-কালো-বাদামি-তামাটে লালের সমন্বয় দেখা যায়। ওড়ার সময় ডানার সাদা ডোরা ও লেজের কালো দাগ চোখে পড়ে। চোখ বাদামি। খাটো ও সোজা চঞ্চুটি কালো। পা খাটো ও পায়ের পাতা উজ্জ্বল কমলা। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারায় পার্থক্য নেই। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের ওপরে হালকা হলদে ঝালর দেখা যায়।
ওরা শীতকালে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগ এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপপুঞ্জের শিলাময় উপকূল, কাদাচর ও বালুতটে একাকী, জোড়ায়, ছোটো ঝাঁকে বা সৈকত পাখির মিশ্র ঝাঁকে বিচরণ করে। কাদাচরে ধীরে হেঁটে হেঁটে কাদা বা বালুতে চঞ্চু ঢুকিয়ে, গর্ত করে বা কোনো শামুক-ঝিনুক ও সামুদ্রিক আগাছা উল্টে তার নিচ থেকে জলজ পোকামাকড়, শামুক, চিংড়িজাতীয় প্রাণী, কেঁচো ইত্যাদি খুঁজে খায়। শত্রু বা বিপদ দেখলে উপকূলের পাথর, খোলক বা আবর্জনার স্তূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। তাড়া খেলে দ্রুত 'টুকা-টুক-টুক...' ও ওড়ার সময় উঁচু কণ্ঠে ছোট্ট করে 'চিক-ইক...' শব্দে ডাকে।
মে থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় মূল আবাস এলাকা, যেমন- উত্তর আমেরিকার উত্তর মেরুর তুন্দ্রা অঞ্চল ও সাইবেরিয়ার শিলাময় উপকূলের উন্মুক্ত প্রান্তরে অগভীর খোদল করে তাতে লতাপাতার লাইনিং দিয়ে বাসা বানায়। স্ত্রী ২-৫টি মসৃণ ও চকচকে গোলাকার ডিম পাড়ে। ডিমের রং গাঢ় বাদামি ছিটসহ হালকা সবুজাভ-বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ২২-২৪ দিনে। শুধু পুরুষ পাখিই ছানাদের লালনপালন ও যত্ন করে। ছানারা ১৯-২০ দিনে উড়তে শিখে। প্রায় দু'বছরে বয়োপ্রাপ্ত হয়। আয়ুস্কাল সাত বছরের বেশি।
লেখক : অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
- বিষয় :
- বিহঙ্গ কথা
