ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিহঙ্গ কথা

বঙ্গবন্ধু ও তার পায়রা

বঙ্গবন্ধু ও তার পায়রা
×

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসায় আদরের পায়রা পরিচর্যায় বঙ্গবন্ধু - সংগৃহীত

আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২১ | ১৩:৫৮

১৭ মার্চ ১৯৭৪। সবেমাত্র প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫৪তম জন্মবার্ষিকী। বঙ্গবন্ধু শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন, তাই সেবারের জন্মবার্ষিকীটি শিশুদের সঙ্গে পালন করতে চাইলেন। ঢাকা শহরের বেশকিছু স্কুলের সঙ্গে আমাদের সেগুনবাগিচা প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দাওয়াত পেল। বয়স ও আকারে ছোট হওয়ায় সৌভাগ্যবশত লাইনের প্রথমেই আমাকে দাঁড় করানো হলো। সে কারণে সহজেই বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি আসতে পারলাম। একসময় তিনি লাইনের সামনে এসে আমার চিবুকে আদর করলেন। পরম যত্নে তার হাতখানা রাখলেন মাথায়। আমি কিন্তু এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। অত্যন্ত খুশি হয়েছিলাম তার হাতের ছোঁয়ায়। তবে শুধু হাতের ছোঁয়া এবং আদরের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি একে একে সামনের প্রথম দুই-তিন সারির প্রায় সবার মাথায় হাত রেখে মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশের সেবা করার জন্য দোয়া করলেন।
বাংলাদেশের স্থপতি ও শিশুদের অকৃত্রিম বন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে শুধু এদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা ছিলেন, তা নয়; বরং তিনি ছিলেন বিশ্বনেতা। তা ছাড়া তিনি শুধু একজন মহান রাজনীতিবিদ ও দার্শনিকই ছিলেন না, একজন প্রকৃতিপ্রেমীও ছিলেন। প্রকৃতির জন্য তার ছিল মন উজাড় করা ভালোবাসা। প্রকৃতি ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে খেলা করে আশৈশব কাটিয়েছেন তিনি। গ্রামবাংলার গাছপালা-লতাপাতা-ফুল-পাখি-প্রাণী-প্রজাপতির সৌন্দর্যে তিনি মোহিত হয়ে প্রকৃতিকে ভালোবেসেছিলেন। প্রকৃতির প্রতি তার এই অসম্ভব আকর্ষণ ও ভালোবাসার কারণে তিনি প্রায়ই গায়ে ধুলাবালু মাখতেন ও পুরো দেহে কাদা মেখে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করতেন কীভাবে বাবুই পাখিরা নিপুণভাবে বাসা বোনে? কীভাবে মাছরাঙা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মাছ ধরে? দোয়েলের বাসা খুঁজে বেড়াতেন ও ওদের মিষ্টি স্বরের গান শুনতে পছন্দ করতেন।
প্রকৃতির প্রতি অসম্ভব ভালোবাসার কারণে বঙ্গবন্ধু দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সুন্দরবন থেকে জাফলং-তামাবিল ঘুরে বেড়িয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সফরের সময় তিনি কখনোই সেসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অবগাহন করতে ভুলতেন না; বরং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করে মুগ্ধ হতেন। দেশের প্রকৃতি ও পাখি-প্রাণীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে বঙ্গবন্ধু শুধু এদের সংরক্ষণের দিকেই নজর দেননি; বরং প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় করানো ও বৃহত্তর স্কেলে সংরক্ষণ করার দিকেও নজর দিয়েছিলেন। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসার স্মৃতিস্বরূপ দেশের দুটি সাফারি পার্ক- একটি কক্সবাজারের ডুলাহাজারায় ও অন্যটি গাজীপুরের শ্রীপুরে, জাতির পিতার নামে নামকরণ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত যুক্তিসংগত হয়েছে বলেই মনে করি। তবে সাফারি পার্ক দুটি চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা এবং এদেশের বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় পাখি-প্রাণী সংরক্ষণের কাজে ব্যবহূত হলেই পাখি-প্রাণী সংরক্ষণে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন হবে।
অন্যান্য পাখি-প্রাণীর মতো কবুতর বা পায়রার প্রতিও ছিল বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা। মুক্ত আকাশে পায়রা ছেড়ে দেওয়া হাস্যোজ্জ্বল বঙ্গবন্ধুর একাধিক ছবি সুপরিচিত। পায়রার প্রতি তার আসক্তি ও গভীর মমতার কারণে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় 'শান্তির দূত' পায়রা পুষতেন। প্রতিদিন ভোরে তিনি তার আদরের পায়রাগুলোকে খাবার দিতেন, ওদের সঙ্গে আকারে-ইঙ্গিতে কথা বলতেন। পায়রাগুলো যেন তার কথা বুঝতে পারত। তার সেই পায়রার বাসা স্মৃতিস্বরূপ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় রেখে দেওয়া হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর আদরের পায়রা বিশ্বে শান্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এবার বুনো পায়রা সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যাক। জানা মতে, রোমানরাই সর্বপ্রথম পায়রাকে (বা ঘুঘুকে) 'শান্তির প্রতীক' হিসেবে গণ্য করা শুরু করে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, পায়রার সঙ্গে মানুষের প্রথম পরিচয় ঘটে পাঁচ-ছয় হাজার বছর আগে। প্রায় দুই হাজার বছর আগে বুনো পায়রাকে পোষ মানিয়ে গৃহপালিত করা হয়। তবে, এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মুসলিম সুফি সাধক ও ইসলাম ধর্ম প্রচারক হজরত শাহজালাল (রহ.) এদেশে আসার সময় সঙ্গে করে পায়রা নিয়ে এসেছিলেন, সেগুলোর বংশধররাই আজ 'জালালি কবুতর' নামে পরিচিত। কাজেই এদেশে বুনো পায়রার কোনো মূল বংশধারা আছে কিনা, সন্দেহ? এদের প্রায় সবই প্রকৃতিতে ফিরে যাওয়া জালালি কবুতরের বংশধর, যারা অনেকটা না বুনো, না পোষা স্বভাবের। তাই এগুলোকে উপপ্রাকৃতিক পায়রা (Feral Pigeon) বলা যায়।
এদেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি বুনো পায়রা জালালি কবুতর, জংলা কবুতর, বুনো কবুতর, কপোত বা গোলা পায়রা (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ব্লু রক পিজিয়ন, রক ডাব, রক পিজিয়ন বা কমন পিজিয়ন। কোলাম্বিডি গোত্রের পায়রার বৈজ্ঞানিক নাম Columba livia। প্রাকৃতিকভাবে বুনো পায়রা পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা।
পায়রার দৈর্ঘ্য ২৯-৩৭ সেন্টিমিটার ও ওজন ২৩৮-৩৮০ গ্রাম। পায়রা-পায়রি দেখতে প্রায় একই রকম। এদের মাথা, ঘাড় ও গলা গাঢ় ধূসর। ঘাড়-গলায় ধাতব সবুজ ও গোলাপি জ্বলজ্বলে আভা রয়েছে। পিঠ, ডানা, বুক ও পেট হালকা ধূসর। ডানায় দুটি কালো চওড়া ডোরা দাগ থাকে। ধূসর লেজে প্রশস্ত কালো দাগ। চোখ কমলা। চঞ্চু কালো। নীলচে আভাসহ পা, পায়ের পাতা ও আঙুল গোলাপি। নখ কালচে।
বুনো পায়রা বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের যে কোনো এলাকায় দেখা যায়। সচরাচর দল বেঁধে বাস করে। পায়রা বেশ সাহসী ও লড়াকু। মাটিতে হেঁটে হেঁটে শস্যবীজ ও শস্যদানা খুঁটে খায়। সচরাচর 'গুটর-গু্তগুটর-গু-ও-ও্ত-' শব্দে ডাকে।
এরা সারাবছরই প্রজনন করে। পূর্বরাগের সময় পায়রা গলার থলি ফুলিয়ে নাচতে নাচতে ও লেজের পালক পাখার মতো মেলে ধরে পায়রিকে আকর্ষণ করে। পুরোনো ধ্বংসাবশেষ, দালানের ফাঁকফোকর ও লোকালয়ে দল বেঁধে কাঠিকুটি দিয়ে বাসা বানায়। পায়রি তাতে দুটি করে সাদা রঙের ডিম পাড়ে। পায়রা-পায়রি পালাক্রমে ডিমে তা দেয় ও ১৭-১৯ দিনে ডিম ফোটে। ছানারা ২৪-২৮ দিনে উড়তে শেখে। বয়ঃপ্রাপ্ত হতে প্রায় ১৪০ দিন সময় লাগে। আয়ুস্কাল পাঁচ-ছয় বছর।
লেখক :অধ্যাপক, বশেমুরকৃবি, গাজীপুর।

আরও পড়ুন

×