বিহঙ্গ কথা
রহনপুরের পরিযায়ী প্যাঁচা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরইল বিলের পাশে চরে উড়ন্ত পরিযায়ী প্যাঁচা- লেখক
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৪:০৩
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী চরইল বিল জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বিলের ঘাট থেকে নৌকায় চড়ে খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বিল থেকে মাঠে নেমেই চোখে পড়ল ভারতের উড়ন্ত পতাকাটি। অদূরে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। বুঝতে আর বাকি রইল না, আমরা নো ম্যানস ল্যান্ডে ঢুকে গেছি। কাজেই তাড়াতাড়ি কাজ সেরে নৌকায় উঠতে হবে। তবে মাঝি অভয় দিল, এখানে বিএসএফ আসে না। তা ছাড়া এখানকার বেশিরভাগ জমিই বাংলাদেশিরা চাষ করে। মাঠে নেমে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে প্রথমেই যাকে দেখলাম সে হলো ভরত (Rufous-winged Bushlark। এর পর লাল-লতিকা হট্টিটি (Red-wattled Lapwing) এবং শেষে বিশাল আকারের মদনটাক (Lesser Adjutant)। মদনটাকের কয়েকটি উড়ন্ত ছবি তোলার পর ছোট্ট একটি পাখিকে আকাশে উড়তে দেখলাম। ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে শাটারে দু-তিনটা ক্লিক করতেই পাখিটি মাঠে নেমে কোথায় যেন হারিয়ে গেল, আর খুঁজে পেলাম না। তবে জায়গাটাকে আমি স্পট করে রেখেছিলাম এবং সেদিকে কিছুটা এগোতেই সে ওখান থেকে উড়ে আরেক জায়গায় গিয়ে বসল। এভাবে কয়েকবার আমাদের ঘোলা পানি খাওয়াল। আমরাও লেগে থাকলাম এবং শেষ পর্যন্ত ওর কিছু ভালো ছবি তুলতে সক্ষম হলাম। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের ঘটনা এটি।
নো ম্যানস ল্যান্ডে দেখা পাখিটি এদেশের বিরল ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন পরিযায়ী পাখি বা ভ্রমণকারী প্যাঁচা। পশ্চিমবঙ্গে ওর নাম ছোটোকান প্যাঁচা। ইংরেজি নাম Short-eared Owl। স্ট্রিজিডি গোত্রের প্যাঁচাটির বৈজ্ঞানিক নাম Asio flammeus। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার আবাসিক পাখিটি শীতে এদেশে পরিযায়ন করে।
পরিযায়ী প্যাঁচা বড় মাথা ও চোখ এবং খাটো ঘাড় ও চওড়া ডানার পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক প্যাঁচার দেহের দৈর্ঘ্য ৩৪-৪৩ সেমি; প্রসারিত ডানা ৮৫-১১০ সেমি; ওজন ২০৬-৪৭৫ গ্রাম। দেহের ওপরের পালক গাঢ় ছিটযুক্ত তামাটে থেকে বাদামি। দেহের নিচটা হলদেটে; বুকের ওপরে রয়েছে গাঢ় ডোরা। ডানা ও লেজে কালো ও গোলাপি ডোরা। কালচে-বাদামি কানঝুঁটিটি ছোট। মুখমণ্ডলের গোলক দুটি সুস্পষ্ট। চোখ হলদে। গলায় ঘন বাদামি গলাবন্ধ। আঙুলের খোলা অংশ কালচে-বাদামি ও নখ শিঙ-কালো। চঞ্চু কালো ও পা হলদে। প্যাঁচা ও পেঁচির চেহারায় কোনো পার্থক্য নেই।
ওরা দেশব্যাপী বড় নদীর চর, ঝোপঝাড়, খোলা প্রান্তর এবং উপকূলীয় এলাকায় সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ৫-৬টির ছোট দলে বিচরণ করে। অন্য প্রজাতির প্যাঁচার মতো গাছে আশ্রয় না নিয়ে মাটিতে বসে থাকে। নিশাচর প্যাঁচাটি দিবাচর এবং সান্ধ্যচারীও। ভূমির কিছুটা ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে পায়ের তীক্ষষ্ট নখ দিয়ে ছোট পাখি, ইঁদুর, পঙ্গপাল, ফড়িং, গুবরে পোকা ইত্যাদি শিকার করে খায়। আতঙ্কিত হলে হিস-হিস শব্দ করে। মথ বা বাদুড়ের মতো ওড়ে। একটানা 'ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক...' বা 'টুট-টুট-টুট-টুট-টুট...' শব্দে ডাকে।
মার্চ থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় আবাস এলাকার অর্থাৎ উত্তর মেরুর ভূমিতে ঘাসের গোড়ায় ঘাস ও পালক দিয়ে বাসা তৈরি করে। ডিম পাড়ে ৪ থেকে ১২টি; রং সাদা। পেঁচি একাই ডিমে তা দেয়। ছানাদের ওড়ার পালক গজাতে এক মাসের বেশি সময় লাগে। এক বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়। আয়ুস্কাল সাত বছরের বেশি।
লেখক :অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।
- বিষয় :
- বিহঙ্গ কথা
