বিহঙ্গ কথা
দুর্লভ কালো কাঁচিচোরা
টাঙ্গুয়ার হাওরে একটি কালো কাঁচিচোরা - লেখক
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৪:৩৫
সাপ পাখির ছবি তোলার জন্য ২০১৪-এ প্রকৃতিপ্রেমী মারুফ রাসেলসহ দ্বিতীয় দিনের মতো বাইক্কা বিলে নৌকা নিয়ে ঘুরছি। বেশ দূরে একটি পাখি দেখে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে বসে আছি, এমন সময় মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক পাখি উড়ে গেল। মারুফ বলল, 'মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখিগুলো একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে, স্যার।' আমি বললাম, 'যেটার টার্গেট নিয়ে এসেছ, সেই দিকে মন দাও।' সেদিন মনোযোগ দিয়ে সাপ পাখির বেশ ভালো ভালো ছবি তুলতে পেরেছিলাম। কিন্তু রাতে হোটেলে মারুফ যখন তার ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো দেখাচ্ছিল, তখন মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া চকচকে কালো পাখিগুলোর ছবি দেখে বেশ আফসোস হলো। ইস্, তখন যদি ওর কথায় টার্গেট ছেড়ে মাথার ওপরে কিছুটা মনোযোগ দিতাম তাহলে দুর্লভ পাখিগুলোর ছবি তুলতে পারতাম। এরপর দীর্ঘ চার বছর ধরে ওদের পাওয়ার সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও দেখা পাইনি। কিন্তু ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ওদের দেখেছি টাঙ্গুয়ার হাওরের বিভিন্ন বিলে। অবশ্য কভিড-১৯-এর কারণে গত দু'বছর টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়া হয়নি।
যা হোক, নতুন বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি শ্রীমঙ্গলের বাইক্কার বিলের টাওয়ার থেকে পাখি পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আগের তুলনায় পাখির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। মনে হচ্ছে বাইক্কা বিলের পরিবেশ আগের মতো ভালো নেই। তা ছাড়া খাদ্যের উৎসও কমে গেছে অনেক। সে কারণে পরিযায়ী পাখিও কম আসছে। যাক, বিভিন্ন পাখির ছবি তুলতে তুলতে এক সময় একটি উড়ন্ত বড় পানকৌড়ির দিকে চোখ গেল। মাত্র তিনটি ক্লিক করেছি, এমন সময় ক্যামেরার ফ্রেমে লম্বা গলার চকচকে কালো সাতটি পাখি অযাচিতভাবে ঢুকে গেল। রোদের আলো ওদের ডানার ওপর পড়ায় ওগুলোর সবুজাভ আভা যেন জ্বলজ্বল করে উঠল! বড় পানকৌড়ি বাদ দিয়ে ওদের দিকে মনোযোগ দিলাম। ক্যামেরার ফ্রেম থেকে পাখিগুলো বের হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত শাটারে ক্লিক করে গেলাম।
আট বছর পর ফের বাইক্কার বিলে দেখা চকচকে কালো পাখিগুলো আর কেউ নয়; এ দেশের এক দুর্লভ পরিযায়ী জলচর পাখি কালো কাঁচিচোরা। লাল কাঁচিচোরা, লালচোরা, কাঁচিখোঁচা, চকচকে দোচরা, দোচরা বা রামকর নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Glossy Ibis| Threskiornithidae গোত্রের কাঁচিচোরার বৈজ্ঞানিক নাম Plegadis falcinellus। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াজুড়ে পাখিটির বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্ক কাঁচিচোরার দেহের দৈর্ঘ্য ৪৮-৬৬ সেন্টিমিটার (সেমি), প্রসারিত ডানা ৮০-৯৫ সেমি ও ওজন ৪৮৫-৫৮০ গ্রাম। প্রজননহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কালো কাঁচিচোরার দেহের রং সবুজাভ গাঢ় বাদামি। ঘাড়-মাথা বাদামি ও তাতে সাদা সাদা সরু টান। ডানার ওপরের প্রান্ত শাড়ির আঁচলের মতো চওড়া চকচকে সবুজাভ-নীলচে। প্রজননকালে চেহারার রং যেন খুলে যায়। এ সময় দেহের রং হয়ে যায় ঘন-জলপাই বা লালচে মেরুন-সবুজ। ঘাড়-চিবুক-গলাজুড়ে থাকে সবুজ-বেগুনি চমৎকার ছিটছোপ। পুরো দেহের পালকে যেন নীলচে-সবুজ তেল মাখানো থাকে। চোখ নীলচে-কালো। চোখের পাশ থেকে চঞ্চুর গোড়া পর্যন্ত দুটো সাদা টান দেখা যায়। বুক-পেট হয় জলপাই। কাস্তের মতো লম্বা চঞ্চুটি জলপাই-ধূসর ও তাতে বাদামির আভা মেশানো। চঞ্চুটি বাটালির মতো শক্ত। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল রুপালি-বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও আকারে স্ত্রী কিছুটা ছোট।
কালো কাঁচিচোরা স্বাদুপানির জলা, হ্রদ, হাওর, বিল, প্লাবিত তৃণভূমি ও ধানক্ষেতে বিচরণ করে। এ দেশে মূলত সিলেটের হাওর অঞ্চল ও রাজশাহী বিভাগের জলাশয়ে দেখা যায়। দিবাচর, জলচর ও ভূচারী পাখিগুলোকে ১০-৫০টির দলে দেখা যায়। অল্প পানিতে হেঁটে হেঁটে কাদা ও অগভীর পানিতে কাস্তের মতো বাঁকা চঞ্চুটি ঢুকিয়ে দিয়ে মাছ, ব্যাঙ, শামুক-গুগলি, জলজ কীটপতঙ্গ ইত্যাদি ধরে এনে খায়। শামুকের মুখের খোলসটি দু-এক ঠোকরে আলগা করে ফেলতে সক্ষম। সচরাচর নীরব, মাঝে মাঝে ভেড়ার মতো ডাকে।
মে থেকে জুলাই মাস প্রজননকাল। এ সময় ওরা সচরাচর পানির ধারে আংশিক জলমগ্ন গাছে ডালপালা ও কাঠিকুটি দিয়ে মাচার মতো ছোট বাসা বানায়। স্ত্রী তাতে গাঢ় নীলচে-সবুজ রঙের তিন-চারটি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ২০-২৩ দিনে। বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া ও ছানাদের লালনপালনের দায়িত্ব বাবা-মা মিলেমিশে করে। ছানারা আট দিন বয়সেই বাসা ত্যাগ করতে সক্ষম হলেও ২৫-২৮ দিনের আগে উড়তে পারে না। তবে বাবা-মা ছয়-সাত সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত ছানাদের খাওয়ায়। আয়ুস্কাল ছয়-সাত বছর।
লেখক: অধ্যাপক, বশেমুরকৃবি, গাজীপুর
