ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পুরোনোদের ফেরার সুযোগে উদ্বিগ্ন ব্যাংক উদ্যোক্তারা

গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএবি চেয়ারম্যান

পুরোনোদের ফেরার সুযোগে উদ্বিগ্ন ব্যাংক উদ্যোক্তারা
×

গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে কথা বলেন বিএবি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার -সমকাল

 বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৮:৩১ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ০৯:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে নতুন ধারা যুক্ত করে একীভূত পাঁচ ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে এ উদ্বেগের কথা জানিয়েছে ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। 

গতকাল সোমবার বেলা ৩টা থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক শেষে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিএবি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার। বৈঠকে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান, বিএবির ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান শরীফ জহির, হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এ. কে. আজাদ, ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরী, এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূরুন নেওয়াজ সেলিমসহ বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।
গভর্নরের কাছে বিএবির পক্ষ থেকে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একটি লিখিত প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। এর বিষয় হলো– ‘ব্যাংকিং খাতের উদ্বেগ, সংস্কার প্রস্তাব, শিল্প খাতের পর্যবেক্ষণ, ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনী’।

বৈঠক শেষে আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে আগের মালিকদের ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে আমরা ভয় পাচ্ছি।’ কেন ভয় পাচ্ছেন– এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কোত্থেকে কে এসে আবার উল্টাপাল্টা কাজ শুরু করে দেয়! এটা নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছি। কাজেই সরকারের এটা ভালোভাবে দেখা উচিত। যারা এসব ব্যাংক থেকে টাকা-পয়সা লুট করে নিয়ে গেছে, তাদের যদি আবার দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, পুরো খাতের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করবে। পুরো খাত আবার ক্ষতির মুখে পড়বে।’
আব্দুল হাই সরকার বলেন, সরকার, গভর্নর মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথা শুনেছেন। ইতিবাচকভাবে আলোচনা শেষ হয়েছে।
আইন করেছে সরকার, তাহলে আপনারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কেন এলেন– এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন তো সরকারই করবে। তবে আমরা যেন আবার ক্ষতিগ্রস্ত না হই, ব্যাংক খাতে যেন নতুন করে সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য বিষয়টি জানানো হয়েছে।

ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহির বলেন, গভর্নর জানিয়েছেন, ১৮ক ধারা বাস্তবায়ন হবে না। এই ধারায় যেসব শর্ত রয়েছে, তা পূরণ করে আগের মালিকরা আসতে পারবেন না। এখন আমরা দেখব কী হয়? এ সময় বিএবির চেয়ারম্যান আবার বলেন, ‘আমাদের প্রতিক্রিয়া হলো, এটা ঠিক হচ্ছে না।’

পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান বলেন, ‘গভর্নর জানিয়েছেন, পাঁচ ব্যাংক যে একীভূত হচ্ছে; এটা আর পরিবর্তন হবে না। এটা চলবে। এখান থেকে ফেরত আসার সুযোগ নেই।’ বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা বলেছি, ব্যাংক খাতকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যাতে নতুন কোনো আতঙ্ক তৈরি না হয়। যে কোনো নীতিমালা তৈরির আগে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বন্ধ কারখানা সচল করতে নতুন তহবিল সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল হাই সরকার বলেন, বন্ধ কারখানা সচল করতে চলতি মূলধন তহবিল সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তহবিল দেওয়ার আগে কেন কারখানা বন্ধ হয়েছে; খেলাপি কিনা– দেখতে হবে। অনেক কারণে কারখানা বন্ধ হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়া কিংবা ক্রেতা না পাওয়ার কারণে। ফলে যাদের প্রকৃত ব্যবসা রয়েছে, তাদের চলতি মূলধন সমস্যা থাকলে ব্যাংকগুলো দেখবে।

বিএবির লিখিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আমানতকারীর আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামোকে স্বাগত জানায় বিএবি। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি এড়াতে এবং কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কিছু ধারা পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। বিশেষ করে সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে পুরোনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগের বিষয়টি জবাবদিহি, সুশাসনের মান এবং নৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ছাড়া ব্যাংক কোম্পানি আইনের কিছু ধারা সংশোধনের উদ্যোগ; ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে কাঠামোগত, পরিচালনগত এবং আস্থা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ সমাধানে জবাবদিহি ও সুশাসন কাঠামো জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, মামলা করে খেলাপি ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। আবার আদালত থেকে অনেক ঋণ খেলাপি না দেখাতে বলা হচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। তা না হলে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি মূলধনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। ব্যাংক খাত থেকে সরকারের বেশি ঋণ বেসরকারি খাতকে সংকুচিত করছে। এ ছাড়া নিট মুনাফা করতে না পারায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়সহ অন্যান্য সূচকের উন্নতির ভিত্তিতে উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ, প্রভিশনিং হিসাবায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ব্যাংকের নগদ লভ্যাংশের চেয়ে স্টক লভ্যাংশ বেশি হলে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে। ব্যাংকের মূলধন বাড়ানোর ক্ষেত্রে যা অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে এই ধারার সংশোধনীর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন উদ্যোগ নেয়, সে দাবি জানানো হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান সমকালকে বলেন, আমানতকারীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্বেগ নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে। এর বাইরে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পরিবারের সংজ্ঞায় শ্বশুরপক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ, প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অর্ধেক স্বতন্ত্র পরিচালকসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের বাইরে যেসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে; প্রভিশন রাখতে পারছে না, সেসব ব্যাংকের সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। এর উত্তরে গভর্নর বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএবি থেকে দুজন করে প্রতিনিধির সমন্বয়ে এসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যেসব বিষয় সমাধানযোগ্য কিংবা এই মুহূর্তে সম্ভব না; আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।

 

আরও পড়ুন

×