ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

অমর একুশে গ্রন্থমেলা

লেখক পাঠক রোমাঞ্চ

লেখক পাঠক রোমাঞ্চ
×

শনিবার বইমেলায় শিশুদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটান ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবার্ট আর্ল মিলার ও তার স্ত্রী - ফোকাস বাংলা

জয়নাল আবেদীন

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫৬ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫৯

বর্ষাদুপুরে পাঠকের ভিড়। হঠাৎ দেখা গেল, এক তরুণী যেন কাঁপতে শুরু করেছেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চিৎকার। পাশ থেকে আরেকজন উচ্চ স্বরে বলে ওঠেন, 'কী, খুব বেশি এক্সাইটেড (উত্তেজিত)?' স্টল থেকে বেরিয়ে আসতেই চিৎকার করা তরুণী তাকে জড়িয়ে ধরলেন, যেন অনেক প্রতীক্ষার পর কিছু পেলেন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্টল বর্ষাদুপুরের সামনে এগিয়ে কথা হয় ওই তরুণী হেমার সঙ্গে; ধানমন্ডির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের শিক্ষার্থী। সঙ্গে দুই সহপাঠী আইরিন আক্তার ইভা ও পারভেজ হোসেন। হেমার কণ্ঠস্বরে তখনও কাঁপনের রেশ রয়ে গেছে। নিজের প্রিয় লেখিকা মৌরি মরিয়মকে আচমকা দেখেই এ উত্তেজনা। ফেসবুকের সৌজন্যে লেখিকার সঙ্গে বহুদিনের 'অদেখা' সম্পর্ক। দূর থেকে, তবে আত্মিক সম্পর্কই তাদের।

আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ফাহিম আহমেদ হন্তদন্ত হয়ে এলেন সময় প্রকাশনীর সামনে। দম ফেলতে ফেলতে খুঁজতে লাগলেন জাফর ইকবালকে। যেন কেউ খবর দিয়েছে, প্রিয় বিজ্ঞান লেখক এখানে তার অপেক্ষায়। তার মতো আরও দু'জন মাহবুবা শান্তা ও হুমায়রা কথা বললেন চোখে চোখে। তাদের অনুচ্চারিত ইশারা যেন বলছিল, জাফর ইকবাল কখন এলেন!

'ত্রাতিনা' হাতে নিয়ে ফাহিমের স্বগোক্তি, এই যে জাফর ইকবাল! বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বইটি বগলদাবা করে চলে গেলেন; যেন প্রিয় লেখককে সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরছেন।

সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় গতকাল শনিবারও বইমেলার দুয়ার খুলেছিল সকাল ১১টায়। আধঘণ্টা পর সিসিমপুরের মঞ্চে হাজির হালুম আর টুকটুকিরা। শিশুরা যথারীতি আনন্দ ভাগাভাগি করল তাদের সঙ্গে। কেরানীগঞ্জ থেকে মা-বাবার সঙ্গে এসেছিল ছোট্ট পাঠক আমির হামজা। শিশুপ্রহরে মেলায় ঘুরেছে, সিসিমপুরের হালুমদের দেখেছে। ঘোরাঘুরির মধ্যে কিছু ভূতের গল্প সঙ্গী করে ফিরেছে বাড়ি।

ছুটির দিন হলেও দুপুর পর্যন্ত অবশ্য সমাগম ছিল কম। বিকেলে বইছিল মৃদু হাওয়া। উত্তরের মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দিচ্ছিল বসন্তের  আগমনী বার্তা। সন্ধ্যায় শীত আরেকটু জেঁকে বসে। সোয়েটার সঙ্গে না আনার আক্ষেপও শোনা গেল কারও কারও।

সন্ধ্যার পর উদ্যানজুড়ে টুকরো টুকরো ছবি। এখানে ওখানে বিচ্ছিন্ন আড্ডা এবং ছোট ছোট গল্পের আসর। অনেকগুলো আড্ডার মধ্যমণি লেখক। পাঠক-লেখকের রোমাঞ্চ দেখা গিয়েছিল আগের দিনও। মেলার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দৃশ্যপট আরও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কথাপ্রকাশের সামনে ঘাসের ওপরে চলছে তুমুল আড্ডা। আড্ডা হচ্ছে সুমন্ত আসলামের সঙ্গে। তিনি জানালেন, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি- এ তিন দিন তিনি পাঠকের জন্য। কাছে-দূরের অনেক পাঠকের আবদার মিটিয়ে প্রতিদিন ছোট ছোট আড্ডায় শামিল হচ্ছেন তিনি। শোনাচ্ছেন নানা গল্প, শুনছেনও অনেক।

লেখক-পাঠক রোমাঞ্চের রং ছড়িয়ে পড়ে স্বাধীনতা স্তম্ভের সামনের সবুজ ঘাসের মাঠেও। লেখকদের ঘিরে সেখানকার অন্যরকম আড্ডার এই মঞ্চ হলো 'লেখক বলছি'। মঞ্চের সামনে চেয়ার পাতা, পাঠকরা যেমন খুশি বসছেন, বিদায় নিচ্ছেন। লেখকের বলন কিন্তু থেমে থাকে না। গতকাল এ মঞ্চে কথা বলেন শামীম রেজা, দীপু মাহমুদ, শিহাব শাহরিয়ার ও সাদিয়া মাহজাবীন। লেখকদের কথা শুনতে শুনতে পাঠকের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম নেয়। তারা কিন্তু প্রশ্ন করতে দ্বিধাও করেন না।

অনিন্দ্য প্রকাশের সামনে আরেকটি আড্ডা। প্রতিশ্রুতিশীল লেখিকা মেহেরুন নেছা রুমাকে ঘিরে তার পাঠক-ভক্তানুরাগীর উচ্ছ্বাস। মেহেরুন এবার এনেছেন সত্যমূলক নারীকথন 'মেঘ-জলের জীবন'। লেখিকার অভিব্যক্তি, বোধ ও বিবেকের সহজ উন্নত বিস্তারে তার লেখার জগতে 'নারী' একটি বিশেষ অধ্যায়। পিতার ঘর থেকে স্বামীর ঘর, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, লেখালেখি কিংবা সৃজনশীলতার অঙ্গন, ভিক্ষুক কিংবা কারখানার শ্রমিক- নারীর চলার পথ কোথাও মসৃণ নয়। দ্বিধা ও ভয়কে দূরে ঠেলে এই দুর্গম পথের সত্য ঘটনা বলার চেষ্টা করেছেন তিনি।

গল্পের আসরগুলোতে প্রিয় লেখকরা মধ্যমণি হলেও এবার আসলে গোটা মেলার মধ্যমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার জন্মশতবর্ষ ছুঁয়ে গেছে প্রায় সব লেখক-প্রকাশককে। এবার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশ হচ্ছে নানান কিছু। গতকাল পাঠ উন্মোচন হয় ভ্রমণসাহিত্যের কাগজ 'ভ্রমণগদ্যে'র। এটিও বিশেষভাবে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব কবি কামাল চৌধুরী প্রধান অতিথি ছিলেন। ভ্রমণগদ্য সম্পাদক কবি মাহমুদ হাফিজ ছাড়াও ছিলেন পাখি বিশেষজ্ঞ ড. ইনাম আল হক, ফারুক মঈনউদ্দীন, শাকুর মজিদ, মোল্লা আমজাদ হোসেনসহ অনেকে।

বিভিন্ন প্যাভিলিয়ন ও স্টল ঘুরে কথা হয় প্রকাশক, বিক্রয়কর্মী ও পাঠকের সঙ্গে। শুক্রবার থেকে মেলায় ভিড় বেড়েছে। তবে প্রতি ছয়জনের একজন বই কিনছেন বলে ধারণা বিক্রয়কর্মীদের। অবশ্য তারা এতে অখুশি হচ্ছেন না; বরং আগ্রহী পাঠকের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে তাদের।

নতুন বই : গতকাল নতুন বই এসেছে ২০১টি। এ নিয়ে সাত দিনে প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা ৮৪১টি। অষ্টম দিনে সংখ্যাটি যে হাজার স্পর্শ করবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে নাম জমা পড়েনি, এমন বইয়ের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। গতকালের নতুন বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- জুলফিকার নিউটনের প্রবন্ধ 'বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতি' (শোভা প্রকাশ), বেলাল চৌধুরীর 'বত্রিশ নম্বর' (আগামী), মোশতাক আহমেদের সায়েন্স ফিকশন 'রিরি' (অনিন্দ্য), সুমন্ত আসলামের 'প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন চা খেতে আসেন আমাদের বাসায়' (কথাপ্রকাশ), মুহম্মদ জাফর ইকবালের 'আমার সাইন্টিস মামা' (জ্ঞানকোষ) এবং 'টুনটুনি ও ছোটচাচ্চু সমগ্র' (মাওলা ব্রাদার্স), জুয়েল আহসান কামরুলের 'দ্বীপদেশের জেলখানা' (অন্বেষা), তারিক আনাম খানের 'কঞ্জুস' (চারুলিপি), ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামালের 'উপন্যাস ত্রয়ী' (সময়), আহসান হাবীবের 'সেরা ভূত' (অনুপম), শহীদুল ইসলামের 'নিষিদ্ধ গল্প' (পেন্সিল) ও 'দখিনের দ্বীপ' (ভূমিপ্রকাশ)।

শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন :গতকাল সকাল ১০টায় মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় 'ক' শাখায় ১৩০ ও 'খ' শাখায় ৭০ শিশু-কিশোর অংশ নেয়। বিচারক ছিলেন রেজীনা ওয়ালী লীনা, ফয়জুল আলম পাপ্পু ও ফয়জুল্লাহ সাঈদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম।

শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন :সকাল ১০টায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় 'ক' শাখায় ৭৯ ও 'খ' শাখায় ৮৮ শিশু-কিশোর অংশ নেয়। বিচারক ছিলেন এ এস এম মহিউজ্জামান চৌধুরী (ময়না), ইয়াকুব আলী খান ও চন্দনা মজুমদার।

বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে ছিল এম আবদুল আলীম রচিত 'বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। আলোচনায় অংশ নেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি। বক্তব্য দেন এম আবদুল আলীম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি অঞ্জন সাহা, আতাহার খান, টোকন ঠাকুর ও রাসেল আশেকী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ইকবাল খোরশেদ, মাসুদুজ্জামান ও মীর মাসরুর জামান রনি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় গোলাম কুদ্দুসের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন 'বহ্নিশিখা'। সংগীত পরিবেশন করেন আবুবকর সিদ্দিক, অণিমা মুক্তি গোমেজ, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস ও মো. মুরাদ হোসেন। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন প্রিয়ব্রত চৌধুরী (তবলা), আশুতোষ শীল (দোতারা), মো. হাসান আলী (বাঁশি) ও ডালিম কুমার বড়ূয়া (কিবোর্ড)।

আজকের আয়োজন : আজ অষ্টম দিন মেলা ফিরে যাচ্ছে নিয়মিত সূচিতে। বিকেল ৩টায় খুলবে দুয়ার, বন্ধ হবে রাত ৯টায়। বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে মিল্টন বিশ্বাস রচিত 'উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন প্রশান্ত মৃধা। আলোচনায় অংশ নেবেন পাপড়ি রহমান ও মোজাফ্‌ফর হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আরও পড়ুন

×