হলজীবনের রোজা
এমএজি ওসমানী হলের ছাদে বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার আয়োজন
মনছুর রহমান
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ | ১২:০৭
আলী জুনায়েদ। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে যার রোজা রাখা শুরু। রমজান ঘিরে তাঁর রয়েছে কতশত স্মৃতি, ভুলে ফল পেড়ে খাওয়া থেকে শুরু করে সেহরিতে সময়মতো না ওঠার কারণে নিয়ম করে মায়ের বকা খাওয়া। বছর ঘুরিয়ে বছর আসে, আর সঙ্গে বারবার রমজানও ফিরে আসে তাঁর জীবনে।
ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে পবিত্র এই মাসের সঙ্গে। সেহরিতে মায়ের বকা খেয়ে শুরু হলেও তাঁর কাছে ইফতারের সময়টা ছিল সবচেয়ে আনন্দের। পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত আর বন্ধুদের সঙ্গে সমুদ্রের পাড়ে বসে ইফতার, সবকিছু যেন এখনও তাঁকে টানে। সেই জুনায়েদ বর্তমানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ৫১তম ব্যাচের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী।
আগের সবকটি রমজান পরিবারের সঙ্গে কাটলেও এই প্রথম তিনি পরিবার ছেড়ে রমজান পালন করছেন। হলের শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর রমজান কেমন কাটছে এই প্রশ্নের জবাবে আলী জুনায়েদ বলেন, আগের পারিবারিক পরিবেশের থেকে হলের রমজান আলাদা হলেও এখানে রয়েছে এক ধরনের সৌন্দর্য ও ঐক্য। বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার, বিভিন্ন ক্লাবের আয়োজন আর সহপাঠীদের ছোটখাটো হাসি-ঠাট্টায় ভরা মুহূর্ত।
মুনতাহসীন মাহমুদ মাহিনের ছোটবেলার কথা। পরিবারের বাকি সদস্যদের রোজা রাখতে দেখে সেও বায়না ধরত রোজা রাখবে বলে। বেশ আগ্রহ আর উদ্দীপনা নিয়ে রোজা রাখলেও তা আর দুপুর পার হতো না। সবাই সুবেহ সাদিক থেকে সূর্য অস্ত পর্যন্ত একটা রোজা রাখলেও তাঁর হয়ে যেত দুইটা। ইফতারের সময় আবার সে থাকে সবচেয়ে প্রাণবন্ত।
এভাবেই কাটে মাহিনের শৈশবের রমজানের দিনগুলো। সে এখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী। বুটেক্সের ৫০তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যয়নরত আছে সে। পরিবারের বাইরে কাটছে তাঁর রমজান। পরিবারের সঙ্গে নির্বিঘ্নে সেহরি - ইফতার কাটনো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে মাহিন। হলে তাঁকে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয় সেহরিতে। একটু দেরি হলে শেষ হয়ে যায় ক্যান্টিনের ভালো খাবার। আবার অন্যদিকে ডাইনিংয়ের খাবার হয় না মানসম্মত।
কিন্তু ইফতারের সময়টা হয়ে ওঠে আনন্দঘন পরিবেশের, বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন ইফতার মাহফিলের দাওয়াতে তৈরি হয় একেক স্মৃতি। সব মিলিয়েই চলছে হল শিক্ষার্থী হিসেবে মাহিনের রমজান। তবে ৪৭তম ব্যাচের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোতাকাব্বির রহমানের গল্পটা বাকিদের থেকে আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলজীবনে কাটানো এটাই তাঁর শেষ রমজান হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ চার বছরের পথচলা শেষে তাঁর গ্র্যাজুয়েট হতে যাওয়ার বাকি কেবল কিছুদিন। প্রথম দিকে পরিবারের অভাব অনুভূত হলেও ধীরে ধীরে হলের বন্ধুরাই হয়ে ওঠে এক নতুন পরিবার।
এখন হলজীবন শেষ হওয়ার কথা চিন্তায় আসলে মন ভারী হয়ে আসে তাঁর। হলজীবনে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করে সে বলে, হয়তো সামনে আরও অনেক রমজান আসবে। কিন্তু শৈশবের পারিবারিক রমজান আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো হলজীবনের এই দিনগুলোই ভবিষ্যতে স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এক সঙ্গে বসে ইফতার করা, কাড়াকাড়ি করে ইফতারি মাখানো কিংবা সেহেরির সময় গল্প করতে করতে খাওয়া এসব মুহূর্ত হলজীবনের রমজানকে ভিন্ন স্বাদ দেয়। ভালো সময়গুলো সত্যিই খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায় আর পরে সেগুলোই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান গল্প। সুব্রত কুমার পাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫০তম ব্যাচের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী।
ছোটবেলা থেকেই যে শিখেছে সব ধর্মের মানুষ এবং তাদের আচার ও অনুষ্ঠানকে সম্মান করা। এই শিক্ষাটা মূলত পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকেই। তাঁর মা সবসময় বলতেন, ‘সবাই মিলে মিলেমিশে থাকলেই জীবন সুন্দর হয়’। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে এসে সেই শিক্ষার বাস্তব রূপ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর কাছে। বিশেষ করে রমজান মাস এলেই হলের পরিবেশটা যেন অন্যরকম হয়ে যায়। বিকেল হলেই শুরু হয় ইফতারের প্রস্তুতি। কেউ খাবার আনতে থাকে, কেউ প্লেট সাজায় আবার কেউ শুধু পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করে। ধীরে ধীরে সবাই বসে আজানের অপেক্ষা করে, আর আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় সম্মিলিত ইফতার। কেউ একটু বেশি ক্ষুধার্ত হয়ে খাবারের দিকে তাকিয়ে আছে, আবার কেউ হাসতে হাসতে বলে ওঠে, ‘আর কত মিনিট বাকি?’ এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাঁর ইফতারকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।
- বিষয় :
- রোজা
