সবুজ ভবিষ্যৎ রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও বননীতির তাগিদ
ফাইল ছবি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ২২:০৯ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ২২:২৫
মেঘ, পাহাড়, ঝর্ণা ও অরণ্যের মিলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। তবে দূর থেকে সবুজ দেখালেও পাহাড়ের সেই সবুজ আচ্ছাদনের গভীরে নীরবে ঘটছে বড় ধরনের পরিবর্তন। একসময়ের তুলনামূলক ঘন ও প্রাণবন্ত উদ্ভিদরাজি ক্রমান্বয়ে পাতলা, দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছে। পার্বত্য অঞ্চলের এই পরিবেশগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা।
আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা
বিশ্বের অন্যতম স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারের (Elsevier) ‘এনভায়রনমেন্টাল চ্যালেঞ্জেস’ (Environmental Challenges) নামক কিউ-ওয়ান (Q1 Indexed) জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। এতে ভূ-স্পেশাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশের পরিবেশগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্ভিদ আচ্ছাদনের পরিবর্তন, তার পেছনের কারণ এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি দেশের পরিবেশ পরিকল্পনা, বন ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন কৌশল নির্ধারণে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণার পদ্ধতি ও মূল ফলাফল
গবেষণায় ১৯৮৯, ১৯৯৮, ২০০৮, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্ভিদের ভবিষ্যতের পূর্বাভাস প্রদানে প্রয়োগ করা হয়েছে ‘আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক–সেলুলার অটোমেটা’ (ANN-CA) মডেল। পাশাপাশি ‘স্পেসিয়াল রিগ্রেশন অ্যানালাইসিস’-এর মাধ্যমে উদ্ভিদ আচ্ছাদন পরিবর্তনের মূল নিয়ামকগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়
•স্বল্প-ঘনত্বের উদ্ভিদ আচ্ছাদন: ১৯৮৯ সালে এই হার ১৫.৮৩ শতাংশ ছিল, যা বেড়ে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ২৮.১৭ শতাংশে। (এর মধ্যে রয়েছে ঘাস, ঝোপঝাড় ও কম ঘনত্বের গাছপালা)।
•মাঝারি-ঘনত্বের উদ্ভিদ আচ্ছাদন: এটি ৭৭.৭৫ শতাংশ থেকে কমে ৬৫.২৯ শতাংশে নেমে এসেছে। (এর মধ্যে রয়েছে ফসলি জমি, মাঝারি গাছপালা ও ছড়িয়ে থাকা বনভূমি)।
এই তথ্য স্পষ্ট করে যে, পাহাড়ের ভালো সবুজ আচ্ছাদনযুক্ত অঞ্চলগুলোর একটি বড় অংশ ক্রমান্বয়ে পাতলা ও বিক্ষিপ্ত সবুজে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ পাহাড় নিজেই নীরবে তার সবুজের ঘনত্ব ও প্রাণশক্তি হ্রাসের বার্তা দিচ্ছে।
২০৩০ সালের উদ্বেগজনক পূর্বাভাস
গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে:
•বিক্ষিপ্ত বা স্বল্প-ঘনত্বের সবুজ আচ্ছাদন বেড়ে ২৯.৭১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
•মাঝারি-ঘনত্বের সবুজ আচ্ছাদন কমে ৬৪.৩৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
•প্রকৃত ঘন বনভূমি বা 'ডেন্স ভেজিটেশন' টিকে থাকতে পারে মাত্র ১.০৩ শতাংশ।
এই চিত্র কেবল পরিবেশবিদদের জন্যই নয়, বরং নীতিমহোল, বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং জলবায়ু পরিকল্পনাকারীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
পরিবর্তনের নিয়ামক ও করণীয়
গবেষণায় উদ্ভিদ আচ্ছাদনের পরিবর্তনের জন্য কেবল বন উজাড়কে দায়ী করা হয়নি; বরং ভূমির ঢাল, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা, আর্দ্রতা সূচক, জনসংখ্যার চাপ এবং মানববসতির সম্প্রসারণকে প্রধান নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই পার্বত্য অঞ্চলের সব স্থানে একই ধরনের বৃক্ষরোপণ বা বন সংরক্ষণ কৌশল কার্যকর হবে না। কোথায় গাছ লাগানো হবে, কোন প্রজাতি নির্বাচন করা হবে এবং কোন এলাকা সংরক্ষণে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—তা স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ঠিক করতে হবে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গবেষণার উপযোগিতা
গবেষণার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো এটি শুধু অতীতের চিত্র তুলে ধরেনি, বরং ভবিষ্যতে কোথায় অবক্ষয় বাড়বে বা কোন অঞ্চল জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ করতে হবে, তার পূর্বাভাস দিয়েছে। সীমিত অর্থ ও জনবল কোন এলাকায় প্রয়োগ করলে সর্বোচ্চ সুফল মিলবে, তা নির্ধারণে বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এই গবেষণা কাজে লাগাতে পারে।
বর্তমানে সরকার দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল কর্মসূচির সঙ্গে যদি গবেষণালব্ধ ভূ-স্পেশাল তথ্য ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস যুক্ত করা যায়, তবে বৃক্ষরোপণ আরও টেকসই হবে। কেননা কেবল গাছ লাগালেই পরিবেশ পুনরুদ্ধার হয় না; সঠিক স্থান নির্বাচন, উপযোগী প্রজাতি বাছাই এবং পরিচর্যা সমানভাবে জরুরি।
জাতীয় পরিবেশ নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতি গভীরভাবে জড়িত। এখানকার উদ্ভিদ আচ্ছাদনের পরিবর্তন তাই কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি জাতীয় পরিবেশ নিরাপত্তা, দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG-13 বা ক্লাইমেট অ্যাকশন) সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই গবেষণা কার্বন সংরক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনা, ভূমিধস প্রতিরোধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখাবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ ভবিষ্যৎ রক্ষায় কেবল গাছের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং বিদ্যমান প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ, অবক্ষয়িত ভূমি পুনরুদ্ধার এবং গবেষণার সঠিক তথ্য মাঠপর্যায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজে লাগানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
গবেষক দলের পরিচয়
এই গবেষণাপত্রের প্রথম ও করেসপন্ডিং অথর হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের পিএইচডি গবেষক আব্দুল্লাহ আর রিয়াদ। সহলেখক হিসেবে রয়েছেন একই বিভাগের অধ্যাপক ও ভূ-স্পেশাল বিজ্ঞানী মোহাম্মদ সফি উল্যাহ এবং গবেষক মো. খায়রুল ইসলাম তুহিন। আন্তর্জাতিক কিউ-ওয়ান জার্নালে এই গবেষণা প্রকাশ দেশের গবেষণা সক্ষমতার একটি বড় স্বীকৃতি।
- বিষয় :
- গবেষণা
- পার্বত্য চট্টগ্রাম
- বনায়ন