ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

এটিইউর সেমিনারে তথ্য

জঙ্গিদের ৮২ ভাগ উদ্বুদ্ধ হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে

জঙ্গিদের ৮২ ভাগ উদ্বুদ্ধ হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
×

প্রতীকী ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৯:৫৯

দেশে জঙ্গিদের ৮২ ভাগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এবং এর মাধ্যমেই উগ্রপন্থায় উদ্বুদ্ধ হয় তারা। বাকি ১৮ ভাগের ক্ষেত্রে অন্যান্য কারণ রয়েছে। উগ্রপন্থায় জড়ানো ব্যক্তিরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এনক্রিপটেড অ্যাপ ব্যবহার করে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার ২৫০ জঙ্গির তথ্য বিশ্নেষণ করে এমন চিত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)।

সোমবার রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এ সময় জানানো হয়, গ্রেপ্তার জঙ্গিদের ৫৬ ভাগ সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২২ ভাগ কওমি মাদ্রাসা ও বাকিরা অন্যান্য ধরনের প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছে।

'জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ নিরোধ' শীর্ষক ওই সেমিনার এবং পরে শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করে এটিইউ। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ফর পিসের সহায়তায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। সেমিনারে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন এটিইউর ডিআইজি দিদার আহম্মেদ।

অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এটিইউর অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান ও পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স) হায়দার আলী খান। এ ছাড়াও বক্তব্য দেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মিলান পাগান, ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান এ. মতিন চৌধুরী ও ডিন অধ্যাপক ড. আবদুল খালেক। বক্তারা যুবসমাজ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের ভয়ানক পরিণতি এবং এ-সংক্রান্ত অপতৎপরতা রোধে করণীয় ও প্রতিরোধের কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার মিস পেনি মরটন ও ডেপুটি ব্রিটিশ হাইকমিশনার কানবার হোসেইন বর বক্তব্য দেন। ব্রিটিশ হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি লুসি ড্যালি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কর্মশালায় শিক্ষার্থীদের মেনটর হিসেবে কাজ করেন।\হএটিইউ প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আবুল কাশেম তার বক্তব্যে জঙ্গিদমনে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের অধিক্ষেত্র, আইনগত বাধ্যবাধকতা ও জনগণের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি আশা করেন, জনসম্পৃক্ততায় জঙ্গিমুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশি-বিদেশি সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

ক্রসফায়ার সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে এটিইউ প্রধান বলেন, 'আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আত্মরক্ষার্থে তাদের শক্তির ব্যবহার করে, এমনকি কাউকে মেরে ফেলে, তাহলে তা আইনগতভাবে ঠিক আছে।'

তিনি বলেন, ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার যাই বলা হোক না কেন, মূল বিষয় হলো ক্ষমতা কি বৈধভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, নাকি অবৈধ? বেআইনিভাবে ক্ষমতার ব্যবহার করা হলে তা অপরাধ। প্রত্যেক নাগরিকের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। একইভাবে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্যও প্রযোজ্য। প্রয়োজনে তারা ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। তবে অবশ্যই তা আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকে করতে হবে।

এটিইউর অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মনিরুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়ানোর একটি বড় কারণ হলো হতাশা। এর থেকে মুক্তি পেতে তরুণদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি জানান, দেশে প্রায় তিন মিলিয়ন মানুষ কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে যুক্ত থেকে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে। জঙ্গি সম্পৃক্ততায় কাউকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী মাশরেক হোসেন বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের আয়োজন খুবই দরকারি। এর ফলে বুঝতে পারব যে, আমাদের জঙ্গিবাদে জড়ানোর চেষ্টা চলছে কিনা। কোন কোন বিষয় থেকে সতর্ক থাকতে হবে।'

সেমিনারে জানানো হয়, গ্রেপ্তার ২৫০ জঙ্গির মধ্যে ২৩০ জনেরই বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ৩৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী জঙ্গিও কয়েকজন ধরা পড়েছে, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। তাদের ২০ ভাগ এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। স্নাতক পাস প্রায় ১৮ ভাগ, এইচএসসি ১৬ ভাগ, মাধ্যমিক ১০ ভাগ, স্নাতকোত্তর ৩ ভাগ, অশিক্ষিত ১২ ভাগ এবং ২২ ভাগ মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। রাজনৈতিক নেতা, এমপি, পুলিশ, অমুসলিম, প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ, লেখক, ব্লগার, সংস্কৃতিকর্মীরা জঙ্গিবাদের ঝুঁকিতে আছেন বলেও জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, তরুণরা স্বভাবতই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়। তারা সহজেই জঙ্গি সংগঠনের সদস্য সংগ্রাহকদের টার্গেটে পরিণত হয়। শহরে খেলা বা সংস্কৃতিচর্চার যথেষ্ট সুযোগ না থাকার কারণেও অনেকে বিপথগামী হচ্ছে। নিজ নিজ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের চর্চা এক্ষেত্রে ভালো ফল দিতে পারে। ধর্মচর্চার কারণে উগ্রবাদে জড়ানোর ঘটনা ঘটে না। পরিবারের সদস্য, ধর্মীয় নেতা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব এবং পুলিশ-জনতার মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরির ওপর জোর দেন অনেকে।

অনুষ্ঠানে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, তুরস্ক, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের জঙ্গি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়। কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত দলীয় উপস্থাপনায় পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করে পরে পুস্তিকা আকারে ছেপে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হবে।

আরও পড়ুন

×