ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

পদ ছোট হলেও প্রভাবে বড়!

পদ ছোট হলেও প্রভাবে বড়!
×

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:৫২

অনিয়ম, দুর্নীতি ও বেআইনি কাজের দায়ে ১১ কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ সংস্থা বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডে (বিটিসিএল)। একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে তারা কোম্পানির কর্মচারীদের কোয়ার্টার বরাদ্দসহ নানা ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছিলেন। তবে সাময়িক চাকরিচ্যুত কর্মচারীদের অভিযোগ, সিবিএ নেতাদের একাংশকে ব্যবহার করে সুবিধাভোগী এক কর্মকর্তার অনিয়ম ও অশোভন আচরণের প্রতিবাদ করার কারণেই তাদের বিরুদ্ধে এমন নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা :গত ৬ অক্টোবর বিটিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (ইমারত রক্ষণাবেক্ষণ-১) আবুল হোসেন মুখ্য মহাব্যবস্থাপক (সম্পত্তি ও ইমারত অঞ্চল) আব্দুর রউফের কাছে একটি চিঠি দেন। এতে তিনি তদন্তের কথা জানিয়ে ১১ কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বেআইনি কাজের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। পরদিন ৭ অক্টোবর উপ-মহাব্যবস্থাপক আবুল হোসেনের স্বাক্ষরে জারি করা অফিস আদেশে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

এ কর্মচারীরা হচ্ছেন- কনিষ্ঠ সহকারী ইকবাল হোসেন তুহিন, বার্তাবাহক সেলিম রেজা, রুবেল মিয়া, হামিদ খান, গার্ড শামীম ইসলাম, মো. ইব্রাহিম, শাহ আলম, আবুল কাশেম, কনিষ্ঠ ইলেকট্রিশিয়ান মাযহারুল হক, শাহ আলম এবং নাছির আহমেদ।

এ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে অফিস আদেশে বলা হয়, তারা পরস্পর যোগসাজশে মতিঝিল ও মগবাজার এলাকার বিটিসিএল কলোনির অনেক কোয়ার্টার অবৈধ দখল করে বহিরাগতদের কাছে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ অবৈধভাবে উপার্জন করছেন। কনিষ্ঠ অফিস সহকারী ইকবাল হোসেন তুহিন এ 'সিন্ডিকেটের হোতা'। তিনি মতিঝিল কলোনির ২৯টি এবং মগবাজার কলোনির পাঁচটি কোয়ার্টার জবরদখল করে রেখেছেন। এভাবে ৩৪টি কোয়ার্টার দখল করে বহিরাগতদের ভাড়া দেওয়ায় পুরো কলোনি এলাকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বিটিসিএলের রাজস্বও কমছে।

অফিস আদেশে আরও বলা হয়, মগবাজার কলোনিতে কোয়ার্টার দখলের পাশাপাশি ইকবাল হোসেন তুহিনের বাবা, তার ভগ্নিপতি এবং তার ফুফা কলোনির প্রায় এক একর জায়গা দখল করে একাধিক স্থাপনা নির্মাণ করেও বহিরাগতদের ভাড়া দিয়েছেন। এসব অবৈধ স্থাপনায় অবৈধভাবে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, ইকবাল হোসেন তুহিন ও সেলিম রেজা মতিঝিল কলোনিতে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে নিজেদের পছন্দমতো একজন কর্মচারীকে অবৈধভাবে বরাদ্দ দিয়েছেন। বৈধভাবে বরাদ্দ পাওয়া কর্মচারীকে ওই কোয়ার্টারে উঠতে দেওয়া হয়নি।

অফিস আদেশে চাঁদাবাজির অভিযোগ করে বলা হয়, গত ৩ অক্টোবর সকাল ১১টায় এই চক্র মগবাজারে উপ-মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয় ঘেরাও করে। তারা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ সংশ্নিষ্ট কাজে ব্যয় না করে তাদের নগদ দিয়ে দিতে ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলামকে চাপ দেন। তাদের নেতৃত্ব দেন প্রথমে সেলিম রেজা। পরে ইকবাল হোসেন তুহিন নিজে এসে উপ-মহাব্যবস্থাপক আবুল হোসেনের কাছে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি ভীতিকর এক পরিবেশ সৃষ্টি করেন। উপ-মহাব্যবস্থাপক তখন নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলামকে ২০ হাজার টাকা তুহিনকে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

সন্ত্রাসের বর্ণনা তুলে ধরে অফিস আদেশে বলা হয়, অফিস সহকারী তুহিনের নির্দেশে সেদিন (৩ অক্টোবর) দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মগবাজার ও মতিঝিল কলোনিতে পানি সরবরাহ বন্ধ রাখেন কলোনি দুটির পাম্পে কর্মরত কর্মচারীরা। তুহিনের নির্দেশ অমান্য করে সেদিন কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করায় বার্তাবাহক আমিনুল ইসলাম তালুকদারকে গত ৬ অক্টোবর রাতে একটি ঘরে আটকে রাখে তার অনুসারীরা। পরে ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলামকে পাঠিয়ে তালা ভেঙে আমিনুল ইসলামকে উদ্ধার করা হয়।

আরও অভিযোগ :বিটিসিএলের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে জানান, অনিয়মের দায়ে কিছুদিন আগে ফেনীতে বদলি হন একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন এবং সাবেক একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সময়ে তিনি বিটিসিএলের 'সম্রাট' হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকারি তদন্তে জাইকার সহায়তায় নেওয়া 'টিএনডিপি' প্রকল্পে গুরুতর অনিয়ম ও অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং উপ-মহাব্যবস্থাপকের অনুগত হিসেবেই ইকবাল হোসেন তুহিন এবং তার অনুগতরা বিটিসিএলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তারপর কোয়ার্টার দখল এবং চাঁদাবাজি চালিয়ে যান।

এরই মধ্যে ওই ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবসরে গেছেন এবং ওই উপ-মহাব্যবস্থাপকও ঢাকার বাইরে ফেনীতে বদলি হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে ইকবাল হোসেন তুহিন 'বিটিসিএল শ্রমিক কর্মচারী লীগ' নামে নতুন একটি সংগঠন খুলে সেটির সদস্য হওয়ার জন্য শ্রমিকদের চাপ দিচ্ছেন। এ সংগঠনের মাধ্যমে তিনি নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু করেছেন। তিনি এখন বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে নিজের সিন্ডিকেট ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এ চেষ্টার অংশ হিসেবেই তিনি গত ৩ অক্টোবর তার ক্ষমতা প্রদর্শনের মহড়া দেন।

সংশ্নিষ্টদের বক্তব্য :এ ব্যাপারে অফিস আদেশে স্বাক্ষরকারী উপ-মহাব্যবস্থাপক আবুল হোসেন সমকালকে বলেন, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং বেআইনি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়ার পরই ১১ কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে মুখ্য ব্যবস্থাপক আব্দুর রউফ বলেন, তিনি পুরো বিষয়টি জানার পর অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন উপ-মহাব্যবস্থাপককে।

অফিস আদেশের ব্যাপারে ইকবাল হোসেন তুহিন জানান, অফিস আদেশের জবাব দিয়ে তিনি গত ৯ অক্টোবর বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে মতিঝিল ও মগবাজার কলোনিতে ৩৪টি কোয়ার্টার দখলের অভিযোগকে তিনি 'ভিত্তিহীন' ও 'বানোয়াট' বলে উল্লেখ করেন। এ দাবির পক্ষে প্রমাণও সংযুক্ত করেছেন বলে জানান তিনি। তুহিন দাবি করেন, কোয়ার্টার বরাদ্দের জন্য ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার যে তথ্য অফিস আদেশে আছে তা ষড়যন্ত্রমূলক এবং ঘুষদাতা হিসেবে যার নাম উল্লেখ রয়েছে, তিনি নিজেই এই ঘুষ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি নিজেই মতিঝিল কলোনির ১৫টি বাসা বহিরাগত সন্ত্রাসীদের কবল থেকে উদ্ধার করেছেন বলে দাবি করেন তুহিন।

২০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়ার ঘটনাকে 'মিথ্যা ও অমূলক' দাবি করে ইকবাল হোসেন তুহিন জানান, আবুল হোসেন নিজের পদে যোগ দেওয়ার পর থেকেই কর্মচারীদের ওপর নানা জুলুম ও নির্যাতন করে আসছিলেন। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই কর্মচারীরা গত ৩ অক্টোবর মগবাজারে উপ-মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে অবস্থান নেন। এ সময় তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপককে কর্মচারীদের কাছে দুঃখ প্রকাশের অনুরোধ জানালেও তিনি রাজি হননি। উল্টো সবার চাকরি খেয়ে ফেলবেন বলে হুমকি দেন।

তুহিন আরও দাবি করেন, বর্তমান উপ-মহাব্যবস্থাপক আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ আয়ের অভিযোগ উঠেছিল এবং গণমাধ্যমেও সে খবর এসেছিল। এখন তিনি তার অনুগত সিবিএ সংগঠনের নেতাদের বিটিসিএলে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্যই ১১ কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×